নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই সমতল অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযানে তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রথম ভাষণেই শান্তি, সম্প্রীতি ও ধৈর্য ধারণের আকুল আবেদন জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা সুনসারিতে হিন্দুত্ববাদী শোভাযাত্রায় উচ্চশব্দে গান বাজানো ও হিন্দুত্ববাদী পতাকা ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে প্রতিবেশী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
নেপালের ভারত সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা সুনসারিতে চরম উত্তেজনা ও সহিংসতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকার সংবেদনশীলতার মাঝে ধর্মীয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা ও পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, গত রোববার গভীর রাতে সুনসারি জেলার একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক শোভাযাত্রায় উচ্চশব্দে গান বাজানো এবং হিন্দুত্ববাদী পতাকা প্রদর্শন নিয়ে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে তর্কবিতর্ক ও সংঘর্ষ শুরু হয়। খবর পেয়ে সহিংসতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সংঘর্ষ তীব্র রূপ নিলে ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সরাসরি গুলিবর্ষণ করে। সুনসারি জেলা কর্মকর্তা পোষণ লামিছানে এবং নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানান, পুলিশের গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় ঘটনাস্থলেই দুজন পুরুষ নিহত হন।
ঘটনার পরপরই বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সুনসারি এবং তার আশেপাশের জেলাগুলোতে কঠোর কারফিউ জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। তবে কারফিউ অমান্য করেই বৃহস্পতিবার নিকটবর্তী সিরাহা জেলায় সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং এতে তৃতীয় আরেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তুলনামূলক নীরব ভূমিকায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এক ভিডিও বার্তা প্রদান করেন। এটি ছিল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণ। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি সরকারের পক্ষে দেশের সকল সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানাচ্ছি—সবাই ধৈর্য ধারণ করুন এবং দেশে শান্তি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখুন।”
ধর্মীয় সহিংসতায় নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ঘটনাটির সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এই নির্মম ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য যারাই দায়ী থাকুক না কেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।”
উল্লেখ্য, নেপাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হলেও দেশটির শতকরা ৮০ ভাগের বেশি জনগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমতল ভূমিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে, যেখানে তারা দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের অধিকার রক্ষা করে পাশাপাসি বসবাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি ও উসকানির কারণে মাঝে মাঝেই এই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তা আবি নারায়ণ কাফলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানান, পুরো এলাকায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২৬
নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় তরাই সমতল অঞ্চলে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তৈরি হওয়া সাম্প্রতিক সংঘাত এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযানে তিনজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বৃহস্পতিবার দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেওয়া প্রথম ভাষণেই শান্তি, সম্প্রীতি ও ধৈর্য ধারণের আকুল আবেদন জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ। ভারতের সীমান্তবর্তী জেলা সুনসারিতে হিন্দুত্ববাদী শোভাযাত্রায় উচ্চশব্দে গান বাজানো ও হিন্দুত্ববাদী পতাকা ব্যবহার নিয়ে বিরোধের জেরে এই সহিংসতার সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তীতে প্রতিবেশী জেলাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়ে।
নেপালের ভারত সীমান্তবর্তী দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা সুনসারিতে চরম উত্তেজনা ও সহিংসতার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী প্রভাব ও সীমান্তসংলগ্ন এলাকার সংবেদনশীলতার মাঝে ধর্মীয় প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই সংঘাত শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী রূপ নিয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তা ও পুলিশের দেয়া তথ্যমতে, গত রোববার গভীর রাতে সুনসারি জেলার একটি গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের এক শোভাযাত্রায় উচ্চশব্দে গান বাজানো এবং হিন্দুত্ববাদী পতাকা প্রদর্শন নিয়ে স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাথে তর্কবিতর্ক ও সংঘর্ষ শুরু হয়। খবর পেয়ে সহিংসতা রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। সংঘর্ষ তীব্র রূপ নিলে ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সরাসরি গুলিবর্ষণ করে। সুনসারি জেলা কর্মকর্তা পোষণ লামিছানে এবং নেপাল পুলিশের মুখপাত্র আবি নারায়ণ কাফলে জানান, পুলিশের গুলিবর্ষণ ও সহিংসতায় ঘটনাস্থলেই দুজন পুরুষ নিহত হন।
ঘটনার পরপরই বিশৃঙ্খলা এড়াতে ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে সুনসারি এবং তার আশেপাশের জেলাগুলোতে কঠোর কারফিউ জারি করে স্থানীয় প্রশাসন। তবে কারফিউ অমান্য করেই বৃহস্পতিবার নিকটবর্তী সিরাহা জেলায় সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় অধিকার রক্ষায় বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং এতে তৃতীয় আরেক ব্যক্তির মৃত্যু হয়।
মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তুলনামূলক নীরব ভূমিকায় থাকা প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এক ভিডিও বার্তা প্রদান করেন। এটি ছিল দেশবাসীর উদ্দেশ্যে তার প্রথম আনুষ্ঠানিক ভাষণ। ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আমি সরকারের পক্ষে দেশের সকল সাধারণ নাগরিক, সুশীল সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রদায়, শ্রদ্ধেয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের প্রতি আন্তরিক আবেদন জানাচ্ছি—সবাই ধৈর্য ধারণ করুন এবং দেশে শান্তি, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও জাতীয় ঐক্য বজায় রাখুন।”
ধর্মীয় সহিংসতায় নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, ঘটনাটির সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এই নির্মম ও অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য যারাই দায়ী থাকুক না কেন, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।”
উল্লেখ্য, নেপাল একটি ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র হলেও দেশটির শতকরা ৮০ ভাগের বেশি জনগোষ্ঠী হিন্দু ধর্মাবলম্বী। নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় সমতল ভূমিতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে, যেখানে তারা দীর্ঘদিন ধরে সংখ্যালঘু হিসেবে নিজেদের অধিকার রক্ষা করে পাশাপাসি বসবাস করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উগ্রপন্থী দৃষ্টিভঙ্গি ও উসকানির কারণে মাঝে মাঝেই এই সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে দেখা যাচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তা আবি নারায়ণ কাফলে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি-কে জানান, পুরো এলাকায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে ন্যূনতম শক্তি প্রয়োগের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

আপনার মতামত লিখুন