বার্তা সংস্থা আল জাজিরা অ্যারাবিককে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান চলমান বৈশ্বিক সংকট, আঞ্চলিক সামরিক মেরুকরণ ও মুসলিম বিশ্বের ঐক্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন। এ সময় তিনি সম্প্রতি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'-কে ইসলামিক বিশ্বের প্রতিরক্ষায় এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দেন। এরদোয়ান স্পষ্ট করেন, নেটো সনদের আদলে গঠিত এই চুক্তি তিনটি দেশের যৌথ নিরাপত্তাকে সুসংহত করবে এবং অন্যান্য ইচ্ছুক মুসলিম রাষ্ট্রের জন্যও এর দরজা খোলা রয়েছে।
একে পার্টির ২৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আল জাজিরা অ্যারাবিককে দেওয়া এ সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান বলেন, "মক্কা চুক্তি একটি কৌশলগত পরিবর্তনের সূচনা। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো তিনটি শক্তিশালী মুসলিম দেশ পবিত্র মক্কা নগরীতে একত্রিত হয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষর করায় বিশ্বমঞ্চে এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছেছে।"
যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (নেটো ধারা ৫-এর আদলে)
মক্কা চুক্তির কার্যকারিতা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেন, নেটো সনদের ৫ নম্বর ধারায় যেভাবে যৌথ নিরাপত্তার অঙ্গীকার করা হয়েছে, এই চুক্তিতেও একই ধরনের যৌথ প্রতিরক্ষা ফ্রন্ট গড়ে তোলা হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, তুরস্ক, পাকিস্তান কিংবা সৌদি আরব—এই তিনটি দেশের যেকোনো একটি যদি বহিঃশত্রু দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তা তিন দেশের ওপর আক্রমণ হিসেবে গণ্য হবে এবং বাকি দুই দেশ আক্রান্ত দেশকে সর্বাত্মক সামরিক সহায়তায় এগিয়ে আসবে। তিনি আরও জানান, এই চুক্তিটি কোনো নির্দিষ্ট তিন দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; মিসরসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ চাইলে এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালী সংকট
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়া প্রসঙ্গে এরদোয়ান সতর্ক করে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে হরমুজ প্রণালী অনতিবিলম্বে উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, "আমরা কোনো যুদ্ধ চাই না, শান্তিকামী রাষ্ট্র হিসেবে আমরা ও পাকিস্তান মধ্যস্থতা ও শান্তির পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।" মধ্যপ্রাচ্যে চলমান রক্তপাতের জন্য ইসরায়েলকে সরাসরি দায়ী করে এরদোয়ান বলেন, "ইসরায়েল এই যুদ্ধের মূল উস্কানিদাতা ও কারিগর। তাদের আগ্রাসী নীতির কারণে পুরো অঞ্চলকে চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে।"
সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা
সিরিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে তুর্কি প্রেসিডেন্ট জানান, দামেস্কের নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ শারার নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে আঙ্কারার সম্পর্ক চমৎকার। তিনি অচিরেই শাম (দামেস্ক) সফর করবেন বলে ঘোষণা দেন। অন্যদিকে ফিলিস্তিন ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসনের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, "গাজা ও লেবাননকে আমরা একাকী ছেড়ে দিতে পারি না। হামাস যুদ্ধবিরতির জন্য সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দেখালেও ইসরায়েলি আগ্রাসন থামছে না।"
পশ্চিমা বিশ্ব ও জাতীয় প্রতিরক্ষা
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের নিকট ফলাইং জেটের (F-35) প্রতিশ্রুতি পালনের আহ্বান জানান। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রসঙ্গে এরদোয়ান স্পষ্ট জানান, "৫৩ বছর ধরে তারা তুরস্ককে ঝুলিয়ে রেখেছে। ইইউতে যোগ দেওয়া আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার নয়; তুরস্ককে বাদ দিলে ক্ষতি তাদেরই হবে, আমাদের নয়।" তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত ও সুসংহত উল্লেখ করে তিনি মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জোর আহ্বান জানান।
মতামত