সৌদি আরবের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ মালয়েশিয়া শিগগিরই বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজারে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া আগামী ছয় মাসে দেশটি প্রায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রথম ধাপে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) ১০ হাজার কর্মী পাঠানো হবে। জুনে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সফল ধারাবাহিকতায় শ্রম অভিবাসনের এই নতুন দুয়ার উন্মোচিত হলো।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের প্রধান এবং সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য হিসেবে শীর্ষে অবস্থান করছে। বর্তমানে সৌদি আরবে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি বসবাস ও কর্মরত আছেন, যা দেশটির সর্ববৃহৎ প্রবাসী সম্প্রদায়। ১৯৭০-এর দশকে দুই দেশের মধ্যে শ্রম চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে প্রবাসীরা প্রতি বছর প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে পাঠাচ্ছেন। তবে এবার মধ্যপ্রাচ্যের পর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য তৈরি হচ্ছে নতুন এক বিশাল সম্ভাবনার ক্ষেত্র।
গত জুন মাসে কুয়ালালামপুরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে শ্রম সহযোগিতা জোরদার ও নতুন কর্মী নিয়োগ ছিল আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়। সেই ফলপ্রসূ আলোচনার পর সম্প্রতি ঢাকায় নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার শুহাদা ওথমানের সঙ্গে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে প্রতিমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে মালয়েশিয়ায় ২ লাখ বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের তথ্য নিশ্চিত করেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের কর্মসংস্থান অনুবিভাগের যুগ্ম সচিব শহিদুল ইসলাম চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানান, "সৌদি আরবের পরই বর্তমানে মালয়েশিয়া বাংলাদেশি অভিবাসীদের দ্বিতীয় বৃহত্তম গন্তব্যে পরিণত হচ্ছে। আমাদের হিসেব অনুযায়ী, মালয়েশিয়ায় ইতোমধ্যে প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসী বসবাস করছেন।" নতুন কর্মী যোগ হওয়ার সাথে সাথে মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশি জনসংখ্যার দিক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে (ইউএই) অতিক্রম করবে। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে আমিরাতে ১০ লাখের বেশি বাংলাদেশি থাকলেও সম্প্রতি সেখানে অভিবাসনের গতি কিছুটা ধীর হয়ে পড়েছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুসারে, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য প্রায় ১৪,৫০০টি ভিসা ইস্যু করেছে, যেখানে একই সময়ে প্রায় ২ লাখ ৭৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
মালয়েশিয়ায় নতুন কর্মী পাঠাতে সরকারিভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে সেপ্টেম্বরের শেষভাগে রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে প্রথম ব্যাচের ১০,০ হাজার কর্মী কোনো ধরনের অভিবাসন ফি ছাড়াই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রী তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে এসব কর্মীদের মালয়েশিয়ায় পাঠাবে সরকার।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, এটি অভিবাসন খরচ একেবারেই শূন্যে নামিয়ে এনে দেশের শ্রম অভিবাসনে একটি নতুন ও ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। এছাড়া ইতোমধ্যেই মালয়েশিয়ায় বসবাসরত কিন্তু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা অনিবন্ধিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের লক্ষ্যে নিবন্ধন প্রক্রিয়াও পুরোদমে চলমান রয়েছে।
মতামত