রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

ছয় মাসের যুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রতিরোধ গড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপে ফেলার কৌশল তেহরানের।

মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সামলে দীর্ঘ যুদ্ধের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ইরান


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সামলে দীর্ঘ যুদ্ধের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ইরান

টানা ছয় মাসের সামরিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল করার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলার বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো এবং জ্বালানি কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার সক্ষমতায় তেহরান এখন আগের চেয়েও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা সংঘাত আরও বিস্তৃত করার কথা বিবেচনা করতে পারে। ফলে মার্কিন প্রশাসনের সাথে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

মার্কিন নির্বাচন ও কৌশলগত রাজনীতি

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের মতে, ইরান আগামী নভেম্বর মাসের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। তেহরানের অভ্যন্তরীণ হিসাব হলো—মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকানদের চরম রাজনৈতিক ব্যাকফুটে ঠেলে দেবে। ওয়াশিংটন বর্তমানে আলোচনার টেবিল ছেড়ে তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। তবে মার্কিন বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর করা হবে, ইরানও তার জবাবে যুদ্ধের মাত্রা তত বাড়াবে।

ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও টিকে থাকার সামরিক কৌশল

ছয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতি হলেও দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে তাদের হাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত বা চাপে ফেলার মতো পর্যপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। তাছাড়া, দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ কমে আসায় ওয়াশিংটনের পক্ষে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাইবার ফ্রন্ট ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

রীতিসিদ্ধ সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সাইবার জগতেও শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, জুলাইয়ের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০০টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ইরান-সমর্থিত হ্যাকাররা হামলা চালিয়েছিল। এতে মূল সার্বিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে না পড়লেও বেশ কিছু অঞ্চলে জরুরি পানি সরবরাহ ও কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

পাশাপাশি, মার্কিনী তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করেও ইরানি হ্যাকারদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে মুসলিম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার আগ্রাসনের বিপরীতে এই ধরনের সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মার্কিন জনগণের মধ্যে নিজেদের সরকারের গৃহীত দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ উসকে দিচ্ছে।

মার্কিন রাজনীতি ও জনমতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা

পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমের দ্বিমুখী নীতি ও প্রোপাগান্ডা নস্যাৎ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা সম্প্রতি ইরানভিত্তিক কিছু অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে বন্ধ করেছে, যেগুলো মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচনকেন্দ্রিক মতামত গঠনে কাজ করছিল।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও আগ্রাসনের মুখে ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান এটিই প্রমাণ করে যে, কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো স্বাধীন জাতিকে দীর্ঘদিন কোণঠাসা করে রাখা যায় না।

বিষয় : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরান

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

রোববার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মার্কিন চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সামলে দীর্ঘ যুদ্ধের আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান ইরান

প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

টানা ছয় মাসের সামরিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দুর্বল করার বদলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে মোকাবিলার বিষয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এই বিস্ফোরক তথ্য উঠে এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও তাদের মিত্রদের সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো এবং জ্বালানি কূটনীতিকে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখার সক্ষমতায় তেহরান এখন আগের চেয়েও বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, তেহরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা সংঘাত আরও বিস্তৃত করার কথা বিবেচনা করতে পারে। ফলে মার্কিন প্রশাসনের সাথে যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানো দিন দিন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।

মার্কিন নির্বাচন ও কৌশলগত রাজনীতি

মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের মতে, ইরান আগামী নভেম্বর মাসের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত এই সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করার কৌশল গ্রহণ করেছে। তেহরানের অভ্যন্তরীণ হিসাব হলো—মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা এবং বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকানদের চরম রাজনৈতিক ব্যাকফুটে ঠেলে দেবে। ওয়াশিংটন বর্তমানে আলোচনার টেবিল ছেড়ে তেহরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার নীতির ওপর জোর দিচ্ছে। তবে মার্কিন বিশ্লেষকদের সতর্কবার্তা, নিষেধাজ্ঞা যত কঠোর করা হবে, ইরানও তার জবাবে যুদ্ধের মাত্রা তত বাড়াবে।

ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও টিকে থাকার সামরিক কৌশল

ছয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের অবকাঠামোগত ব্যাপক ক্ষতি হলেও দেশটির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন প্রযুক্তি এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ 'হরমুজ প্রণালি' নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তাদের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। উল্লেখ্য, বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়।

মার্কিন কংগ্রেসের গোয়েন্দা কমিটির সদস্যদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে তাদের হাতে এখন যুক্তরাষ্ট্রকে পরাস্ত বা চাপে ফেলার মতো পর্যপ্ত প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে। তাছাড়া, দীর্ঘ লড়াইয়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ কমে আসায় ওয়াশিংটনের পক্ষে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাইবার ফ্রন্ট ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ

রীতিসিদ্ধ সামরিক লড়াইয়ের পাশাপাশি সাইবার জগতেও শক্তিশালী উপস্থিতি জানান দিচ্ছে ইরান। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, জুলাইয়ের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১০০টি পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ইরান-সমর্থিত হ্যাকাররা হামলা চালিয়েছিল। এতে মূল সার্বিক নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে না পড়লেও বেশ কিছু অঞ্চলে জরুরি পানি সরবরাহ ও কার্যক্রম ব্যাহত হয়।

পাশাপাশি, মার্কিনী তেল ও গ্যাস অবকাঠামো লক্ষ্য করেও ইরানি হ্যাকারদের সক্রিয়তা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে মুসলিম ভূখণ্ডে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার আগ্রাসনের বিপরীতে এই ধরনের সাইবার ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ মার্কিন জনগণের মধ্যে নিজেদের সরকারের গৃহীত দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ উসকে দিচ্ছে।

মার্কিন রাজনীতি ও জনমতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা

পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমের দ্বিমুখী নীতি ও প্রোপাগান্ডা নস্যাৎ করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে তেহরান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মেটা সম্প্রতি ইরানভিত্তিক কিছু অ্যাকাউন্টের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করে বন্ধ করেছে, যেগুলো মার্কিন রাজনীতি ও নির্বাচনকেন্দ্রিক মতামত গঠনে কাজ করছিল।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য ও আগ্রাসনের মুখে ইরানের এই দৃঢ় অবস্থান এটিই প্রমাণ করে যে, কেবল অর্থনৈতিক অবরোধ বা সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে কোনো স্বাধীন জাতিকে দীর্ঘদিন কোণঠাসা করে রাখা যায় না।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ