জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বৈশ্বিক এই ফোরামে তিনি দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন, তরুণদের কর্মসংস্থান, নারী উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিগত সমতা অর্জনে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন। পাশাপাশি, দীর্ঘ নয় বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার নিজ দেশ মিয়ানমারে নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বৈশ্বিক সহযোগিতার আহ্বান
নিউ ইয়র্ক জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা এবং সকলের জন্য সমান সুযোগ তৈরির মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (UNGA) ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আমরা একটি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্ম বা জাতি নির্বিশেষে প্রত্যেকে উদ্বেগহীনভাবে, নিরাপদে এবং সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারবে।'
প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় ধারাবাহিক অগ্রগতি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গড়ে তুলতে তার সরকার নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
‘থ্রি-আর’ কৌশল ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সরকার ‘থ্রি-আর’ (রিকভারি, রিস্টোরেশন ও রিকনস্ট্রাকশন) কৌশল গ্রহণ করেছে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, 'বাংলাদেশ এখন আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে।' ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা তুলে ধরেন তিনি। এছাড়া দেশকে একটি বৈশ্বিক ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’-এ পরিণত করতে এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেওয়া বিস্তারিত পদক্ষেপের কথা তিনি বিশ্বমঞ্চে জানান। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্ট-আপ বাস্তবায়নে চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।
নারী ক্ষমতায়ন ও সামাজিক সুরক্ষা দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক রূপান্তরের অগ্রভাগে নারীদের রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী হওয়ায় তাঁদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। নারীদের বিনামূল্যে শিক্ষা ও ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে নগদ অর্থায়নের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক বলে মনে করে।' পরবর্তীতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডকে এক ছাতার নিচে এনে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
শিক্ষা, প্রযুক্তি ও নতুন যুগের চ্যালেঞ্জ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দের কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে এই ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক স্তরে বিনামূল্যে খাবার ও পোশাক প্রদান এবং কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও প্রযুক্তির এই যুগে ডিজিটাল বিভাজন যেন বৈষম্য তৈরি না করে, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি জাতিসংঘের মাধ্যমে একটি কার্যকর আন্তর্জাতিক নীতিমালা গ্রহণের তাগিদ দেন।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক মানবিক দিক ভাষণে ১২ লক্ষাধিক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘ নয় বছরের ভার বহনের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান স্পষ্ট জানান, এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক টেকসই প্রত্যাবর্তন। তিনি প্রত্যাবাসন নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রোহিঙ্গাদের জন্য জীবনরক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার জোর দাবি জানান।
ভাষণের শেষে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'আমরা এমন এক বাংলাদেশ গড়তে চাই যেখানে তরুণরা ভয় ছাড়া স্বপ্ন দেখতে পারবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সাথে বাঁচবে এবং প্রতিটি শিশু স্বতঃস্ফূর্তভাবে বেড়ে উঠবে। জনগণ পাবে এক নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা। এজন্যই আমরা বলি— ‘সবার আগে বাংলাদেশ : সবার জন্য বাংলাদেশ’।'
মতামত