আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে আশ্রয়, অর্থায়ন ও পরিচালনা সুবিধা দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ তুলেছে পাকিস্তানের সামরিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো। কাবুলের বারবার অস্বীকার সত্ত্বেও সীমান্ত পেরিয়ে হামলা চালানো এবং আফগান মাটিতে ঘাঁটি তৈরির অকাট্য তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসলামাবাদ। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কেবল চলতি বছরেই আফগান ভিত্তিক হামলায় ১,৩২৭ জন পাকিস্তানি নাগরিক নিহত এবং ২,৪৮৪ জন আহত হয়েছেন।
পাকিস্তানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মতে, দেশটিতে হামলা চালিয়ে নিহত ২৬০ জন আফগান সন্ত্রাসীর পূর্ণাঙ্গ পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। সরকারি নথিতে তাদের নাম, ঠিকানা ও পারিবারিক বিস্তারিত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর দাবি, এই সংখ্যাটি কেবল যাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তাদের; এর বাইরেও অসংখ্য অজ্ঞাতপরিচয় আফগান নাগরিক সীমান্তপারের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে।
ইসলামাবাদ আরও তুলে ধরেছে যে, পাকিস্তানে নিহত আফগান যোদ্ধাদের লাশ আফগানিস্তানে তাদের নিজ গ্রামে ফেরত পাঠানোর পর তালেবান প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের জানাজায় অংশ নিয়েছেন। এক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'যে প্রশাসন দাবি করে তাদের সাথে সন্ত্রাসীদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারা কীভাবে জবাব দেবে যে তাদের কর্মকর্তারা পাকিস্তানে হামলা চালিয়ে নিহত উগ্রবাদীদের জানাজায় উপস্থিত থাকেন?'
পাকিস্তানি গোয়েন্দা তথ্যে প্রকাশ পেয়েছে যে, সীমান্ত অতিক্রমকারী সন্ত্রাসীদের প্রায় ৭০ শতাংশই আফগান বংশোদ্ভূত বা আফগানিস্তান থেকে আসা 'ফিতনা আল-খাওয়ারিজ' (টিটিপির অভ্যন্তরীণ নাম) উগ্রপন্থী। এ ছাড়াও 'ফিতনা আল-হিন্দুস্তান'সহ বিভিন্ন গোষ্ঠী আফগান ভূখণ্ডে থেকে তৎপরতা চালাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, আফগানিস্তানে ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনীর ফেলে যাওয়া আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র—যেমন M4 অ্যাসাল্ট রাইফেল, রেমিংটন স্নাইপার রাইফেল এবং নাইট-ভিশন ডিভাইস—অনায়াসে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হাতে পৌঁছে যাচ্ছে।
জাতিসংঘের এক মূল্যায়নে দেখা গেছে, আফগানিস্তানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর আনুমানিক ৬,০০০ থেকে ৬,৫০০ সশস্ত্র যোদ্ধা সক্রিয় রয়েছে। কেবল গত বছরেই (২০২৫) আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত ৬০০টিরও বেশি সন্ত্রাসী হামলা পাকিস্তানে রেকর্ড করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, আফগানিস্তানের কুনার, নঙ্গারহার, খোস্ত ও পাক্তিকা প্রদেশে টিটিপির প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ও পরিকাঠামো গড়ে উঠেছে। এ সব সেন্টারে তালেবান প্রশাসনের কিছু নিম্নপদস্থ সদস্যও যোগ দিচ্ছে বলে অভিযোগ পাকিস্তানের।
টিটিপি ছাড়াও আল-কায়েদা, ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ETIM) এবং ইসলামিক স্টেট-খোরসান (IS-K)-এর মতো বিপজ্জনক আন্তর্জাতিক চরমপন্থী নেটওয়ার্কগুলো আফগান ভূখণ্ডকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। ইসলামাবাদ বারবার কাবুলের নিকট সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ হস্তান্তর করলেও কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি; বরং পাকিস্তানের পাল্টা পদক্ষেপের সময় তালেবান প্রশাসন সন্ত্রাসীদের সুরক্ষায় এগিয়ে আসে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। পাকিস্তান স্পষ্ট জানিয়েছে, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়—আফগান ভূখণ্ডকে সন্ত্রাসী আখড়া হিসেবে ব্যবহার বন্ধে দৃশ্যমান ও টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে কাবুলকে।
মতামত