ইহুদি উৎসবের অজুহাত দেখিয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরের আল-খলিল (হেব্রন) শহরে অবস্থিত 'হেরেম-ই ইব্রাহিমি মসজিদ' মুসলিমদের জন্য পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে দখলদার ইসরায়েল। ফিলিস্তিনের ওয়াকফ ও ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, সোমবার থেকে বুধবার পর্যন্ত এই মসজিদে নামাজ আদায় ও আজান দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে এ স্থানে মুসলিমদের প্রবেশাধিকার হরণ এবং পশ্চিম তীরে জমি দখল ও সহিংসতার মাত্রা বৃদ্ধিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।
ইব্রাহিমি মসজিদে আজান ও নামাজে ইসরায়েলি নিষেধাজ্ঞা
ফিলিস্তিনের ওয়াকফ ও ধর্মীয় বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইহুদি উৎসবের কথা বলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ইব্রাহিমি মসজিদটি মুসলিমদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর মাধ্যমে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য পুরো মসজিদ প্রাঙ্গণ ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপকে একটি খাঁটি 'ইসলামিক ওয়াকফ' সম্পত্তির পবিত্রতা ও ইবাদতের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি চরম আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
মন্ত্রণালয় আরও সতর্ক করে দিয়েছে যে, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে এই পবিত্র স্থানটিতে সময় ও স্থানভিত্তিক বিভাজন চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করে আসছে। এটি ইসলামিক পবিত্র স্থানগুলোর ওপর ক্রমাগত হানা দেওয়ার এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। ওয়াকফ মন্ত্রণালয় জাতিসংঘ, ইউনেস্কো (UNESCO) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করার এবং ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এই ধরনের জঘন্য লংঘন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ওল্ড সিটি আল-খলিলে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদের আশপাশে প্রায় ১,৫০০ ইসরায়েলি সেনা প্রহরায় মাত্র ৪০০ অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করে পুরো এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে আসছে।
ইহুদি উৎসবের সুযোগে আল-আকসা ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাণ্ডব
ইহুদিদের নববর্ষ (১২-১৩ সেপ্টেম্বর), ইয়োম কিপ্পুর (২১ সেপ্টেম্বর), সুকোট (২৬ সেপ্টেম্বর-২ অক্টোবর) এবং সিমহাত তোরাহ (৩ অক্টোবর) উৎসবকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের আগ্রাসন বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আল-আকসা মসজিদে অনধিকার প্রবেশ ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পুরো পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা বাড়িয়েছে তারা। ফিলিস্তিন ও জর্ডান সতর্ক করেছে যে, ইসরায়েল আল-আকসা ও ইব্রাহিমি মসজিদের ওপর নতুন পরিস্থিতি তৈরি করে পবিত্র স্থানগুলোর ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করছে।
নালিনে হাজার বছরের পুরোনো জয়তুন বাগান উচ্ছেদ ও ভূখণ্ড দখলের ষড়যন্ত্র
একই সময়ে রামাল্লার পশ্চিমে নালিন শহরে ইসরায়েলি দখলদার বাহিনী সড়ক নির্মাণের অজুহাতে শত শত জয়তুন গাছ উপড়ে ফেলছে। প্রায় ২৫,০০০ জনসংখ্যার এই শহরের ফিলিস্তিনিদের প্রধান জীবিকা কৃষি এবং ঐতিহাসিক জয়তুন বাগান। স্থানীয় অধিবাসীরা জানিয়েছেন, এই সড়ক নির্মাণ ফিলিস্তিনি জমিকে টুকরো টুকরো করে ফেলা এবং অবৈধ ইসরায়েলি বসতিগুলোকে যুক্ত করার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
নালিন পৌরসভার মেয়র ইমাদ আল-খাওয়াজা আল জাজিরা ও এএ প্রতিনিধিকে জানান, 'ইসরায়েলি বুলডোজারগুলো নালিনের মানুষের 'খাদ্যের ঝুড়ি' হিসেবে পরিচিত উর্বর কৃষিজমিতে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আগে ৩টি বুলডোজার থাকলেও এখন ৭ থেকে ৮টি বুলেডোজার দিয়ে জমি সমতল করা হচ্ছে।' মেয়র স্মরণ করিয়ে দেন যে, নালিনের ঐতিহাসিক আয়তন ছিল ৫৮,০০০ দুনাম (প্রায় ১৪,৩৩০ একর), কিন্তু ইসরায়েলি দখলদারিত্ব, বর্ণবাদী দেয়াল ও অবৈধ জমি দখলের কারণে এখন ফিলিস্তিনিদের হাতে মাত্র ১০,০০০ দুনাম জমি অবশিষ্ট আছে। এতে প্রায় ৫,০০০ প্রাচীন ও হাজার বছরের পুরোনো জয়তুন গাছ চরম হুমকির মুখে পড়েছে। খাওয়াজা বিশ্ববাসীর কাছে প্রশ্ন তোলেন, 'আমাদের ইতিহাস ও শিকড় মুছে ফেলা হচ্ছে। মানুষ কোথায় যাবে? অবশিষ্ট জমিও এখন ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে।'
রামাল্লায় ফিলিস্তিনি-আমেরিকান নাগরিকের বাড়িতে অগ্নিকাণ্ড ও সন্ত্রাসী হামলা
এদিকে রামাল্লার পার্শ্ববর্তী গ্রামে রাত আনুমানিক ১:৩০ টায় বেশ কয়েকজন সশস্ত্র ইসরায়েলি সন্ত্রাসী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারী হামলা চালায়। ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক মুস্তফা ঈদ জাতারের বাসভবন ঘিরে ফেলে তারা। ঘরে ভাঙচুর চালানোর পাশাপাশি উঠানে থাকা ৩টি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা।
মুস্তফা ঈদ জাতার জানান, তার বাড়িতে থাকা ১৪টি সিসিটিভি ক্যামেরায় তিনি পুরো তাণ্ডব প্রত্যক্ষ করেছেন। পরবর্তীতে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগুন নেভায় এবং আক্রমণকারীদের বিতাড়িত করে। যুক্তরাষ্ট্রে ৯ সন্তান ও ৭৫ নাতি-নাতনির জনক জাতার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, 'আমার আমেরিকার নাগরিকত্ব আছে, কিন্তু তা আমাকে বা আমার পরিবারকে কোনো সুরক্ষা দিতে পারেনি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'ওরা আমাদের জমি ছাড়তে বাধ্য করতে চায়, কিন্তু আমরা মরতে রাজি, তবুও নিজেদের মাতৃভূমি ছেড়ে কোথাও যাব না।'
মতামত