ভারতের তেলঙ্গানা রাজ্যের সিদ্দিপেট জেলায় অবস্থিত ১৭ শতকের বিখ্যাত কুতুব শাহী যুগের 'সালান্দ্রি মসজিদ' চরম অবহেলা ও তদারকির অভাবে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। রামালিঙ্গেশ্বর মন্দির প্রাঙ্গণ ও একটি প্রাচীন বাওলি বা ধাপ-কূপের (সরাই) পাশে অবস্থিত এই অনন্য স্থাপত্যটি কুতুব শাহী শাসনের বহুত্ববাদী ও মুসলিম ঐতিহ্য বহন করছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী স্থানীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক উদাসীনতায় মসজিদটি আজ বিলুপ্তির পথে।
ভারতের তেলঙ্গানা রাজ্যের সিদ্দিপেট জেলার চিন্নাকোদুর মণ্ডলের সালান্দ্রি গ্রামে অবস্থিত প্রাচীন কুতুব শাহী আমলের (১৫১৮-১৬৮৭) 'সালান্দ্রি মসজিদ' উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে মারাত্মক ধসে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। হায়দরাবাদ শহর থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি রামালিঙ্গেশ্বর মন্দির চত্বরে অবস্থিত এবং এর সাথে একটি প্রাচীন বাওলি (ধাপ-কূপ) ও সরাইখানা রয়েছে। ১৭ শতকে কুতুব শাহী সুলতান আবুল হাসানের (১৬৭২-১৬৮৭) আমলে তৎকালীন শীর্ষ দুই প্রধান মন্ত্রী আক্কান্না ও মাদন্না এই সরাইখানা ও সামাজিক চত্বরটি নির্মাণ করেছিলেন।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, সামরিক অভিযানের সময় কুতুব শাহী শাসকেরা 'দণ্ডু বাটা' (সামরিক পথ) ধরে যাতায়াত করতেন। সে সময় প্রতি ১০ কিলোমিটার পরপর হিন্দু ও মুসলিম উভয় সৈন্যের জন্য পৃথক উপাসনালয় হিসেবে মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি নির্মাণ করা হতো। সৈন্যদের তৃষ্ণা মেটানো, গোসল এবং বিশ্রামের জন্য গঠিত এই বিশ্রামাগারটি 'চলিবেন্দ্রম' নামে পরিচিত ছিল, যা কালক্রমে 'সালান্দ্রি' রূপ নেয়।
প্রশাসনিক বৈষম্য ও মুসলিম ঐতিহ্যের প্রতি অবহেলা
সংশ্লিষ্ট এলাকাটিতে বহু দশক ধরে কোনো সরকারি রক্ষণাবেক্ষণ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে গুপ্তধন সন্ধানীদের তাণ্ডবে শিবলিঙ্গ ও প্রাঙ্গণের মারাত্মক ক্ষতি হয়। গত দু’দশকে চিন্নাকোদুর এলাকার এক স্থানীয় শিক্ষক জায়গাটি কিনে নিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে মন্দির ও বাওলি সংস্কার করেন। বর্তমানে সেখানে প্রতি বছর শিবরাত্রিতে জাকজমকপূর্ণ বাৎসরিক মেলা (জাতারা) অনুষ্ঠিত হয় এবং মন্দিরটি পূর্ণ সংস্কার লাভ করে।
তবে বৈষম্য ও চরম উপেক্ষার শিকার হয়েছে প্রাচীন সালান্দ্রি মসজিদটি। চুন-সুরকি ও পাথর দিয়ে নির্মিত এই অনন্য সুন্দর দুই মিনারবিশিষ্ট কুতুব শাহী স্থাপত্যটির পেছনের দেয়ালে একটি বিশাল অশ্বত্থ গাছ গজিয়ে উঠে কাঠামোগত ভিত্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে। দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে ধসে পড়ছে। স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় নিজস্ব অর্থায়নে কোনোমতে সিমেন্ট ও চুনকাম করে তা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করলেও আধুনিক বৈজ্ঞানিক প্রত্নতাত্ত্বিক সংরক্ষণ ছাড়া মসজিদটি রক্ষা করা অসম্ভব।
এর আগে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মৈনাবাদ এলাকার সিকুর গ্রামে ঐতিহাসিক 'জাগীরদার মসজিদ' আবাসন ব্যবসায়ীদের দ্বারা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। ভারতের বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য ও মসজিদগুলোকে হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন, দখল ও সরকারি প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগের চরম বৈষম্যমূলক নীতির কারণে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকার কাঠামোর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
মতামত