ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অজুহাতে একটি ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ আংশিক ভেঙে ফেলার ঘটনায় স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রশাসনের আশ্বাস সত্ত্বেও বুলডোজার ও বিপুল পুলিশ সদস্য পাঠায় মসজিদ রক্ষায় রাতভর অবস্থান নেন শত শত মুসল্লি। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করার পর স্থানীয় মুসলিমরা প্রশাসন কর্তৃক চুক্তি ভঙ্গের প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
ভারতের মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের ঐতিহাসিক শহর উজ্জয়িনে রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অজুহাতে শতাব্দীর প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ ভাঙার প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ফুসে উঠেছে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেয়া প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে মসজিদটির একটি অংশে ভাঙচুর চালানো হয়েছে এবং ঐতিহাসিক মিনারটিকেও হুমকির মুখে ফেলা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন স্থানীয় নগর প্রশাসন মসজিদটির প্রায় আট ফুট অংশ অপসারণের দাবি জানায়। এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় মুসলিম সম্প্রদায়। মসজিদ রক্ষায় সর্বস্তরের মানুষ মসজিদের ভেতরে ও বাইরে কয়েক রাতব্যাপী পাহারা ও অবস্থান কর্মসূচি পালন শুরু করেন। পরবর্তীতে গত ২৭শে সেপ্টেম্বর মসজিদের প্রতিনিধি কমিটি এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে একটি সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমঝোতা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হয়, মসজিদের ঝুলন্ত ফলকের—যেখানে নিয়মিত নামাজ আদায় করা হয় না—মাত্র তিন ফুট অংশ সম্প্রদায় নিজ উদ্যোগে ও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সরিয়ে নেবে।
তবে অভিযোগ উঠেছে, এই সমঝোতার পরদিনই চরম বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দেয় স্থানীয় প্রশাসন। পরদিন সকালে ভারী বুলডোজার ও বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ সদস্য নিয়ে মসজিদ এলাকায় উপস্থিত হয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। এই খবরে আতঙ্ক ও ক্ষোভে হাজার হাজার মানুষ পুনরায় মসজিদের চারপাশে জমায়েত হন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করে এবং টিয়ার গ্যাস (কাঁদানে গ্যাস) ব্যবহার করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
স্থানীয় এক ক্ষুব্ধ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রশাসনের সাথে স্পষ্টভাবে চুক্তি হয়েছিল যে আমরা নিজেরাই সমঝোতা অনুযায়ী নির্দিষ্ট অংশটুকু সরিয়ে নেব। কিন্তু এরপরও কেন ভোরে বুলডোজার ও পুলিশ পাঠানো হলো? এটি আমাদের সাথে স্পষ্ট প্রতারণা। বাধ্য হয়ে আমরা নিজেদের ঐতিহ্য বাঁচাতে নিজেরাই নির্ধারিত অংশ সরানোর কাজ করেছি।”
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, বিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল মসজিদটির একটি ঐতিহ্যবাহী মিনার। মুসল্লিদের পক্ষ থেকে প্রস্তাব রাখা হয়েছিল যে বর্তমান মিনারটি অপসারণের আগে নতুন একটি মিনার নির্মাণের অনুমতি ও সময় দিতে হবে। কিন্তু চরম বৈষম্যমূলক আচরণ করে প্রশাসন সেই যৌক্তিক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে।
এই পুরো ঘটনা ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ইসলামিক স্থাপত্যগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে স্থানীয় মুসলিম ও বিশ্বমানের মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ নতুন করে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশিষ্ট ধর্মগুরু মুফতি জুনায়েদ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, উজ্জয়িনের এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কিছু নয়; বরং শহরের আরও বেশ কয়েকটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ একইভাবে প্রশাসনিক হুমকির মুখে পড়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, এটি কোনো পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং শহরে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে ওঠা মুসলিম ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের দৃশ্যমান উপস্থিতি মুছে ফেলার একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।
বর্তমানে মসজিদটির চারপাশে বুলডোজার ও অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনীর উপস্থিতি স্থানীয় মুসলিমদের মধ্যে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। এটি কেবল সাধারণ রাস্তা প্রসস্থকরণের কোনো স্থানীয় বিরোধ নয়, বরং ভারতে বর্তমান চরমপন্থী রাজনৈতিক পটভূমিতে সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য হুমকির মুখে পড়ার আরও একটি জলন্ত প্রমাণ।
মতামত