যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের সবচেয়ে বড় মসজিদের প্রধান ইমাম সালাহ সারসুরকে (৬৪) দেশ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন অভিবাসন আদালত। গত ৩০ বছর ধরে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত এই বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতাকে ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কণ্ঠ তোলার অপরাধে টার্গেট করা হয়েছে। গত ৩০ মার্চ তাকে আটক করে আশি দিনেরও বেশি বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সম্প্রতি অভিবাসন বিচারক জাইমি সালিনার্দি তাকে দেশত্যাগের চূড়ান্ত আদেশ দেন, যা মার্কিন সংবিধানে সুরক্ষিত স্বাধীন বাকস্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছেন আইনজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনপন্থী কণ্ঠস্বর দমনে ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী তৎপরতার শিকার হলেন উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের অন্যতম প্রভাবশালী মুসলিম ব্যক্তিত্ব ও ‘মিলওয়াকি ইসলামিক সোসাইটি’র প্রধান ইমাম সালাহ সারসুর। দীর্ঘ তিন দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী এবং মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়া ৬ সন্তান ও ১০ নাতি-নাতনির এই অভিভাবককে দেশ থেকে বহিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছে মার্কিন অভিবাসন আদালত।
ইমাম সারসুরের আইনজীবী প্যাট্রিক টরেল ও লুনা দ্রুবি এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (Secretary of State) নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে অভিবাসন বিচারক জাইমি সালিনার্দি এই বিতর্কিত রায় দিয়েছেন। আদেশে উল্লেখ করা হয়, ইমাম সারসুরের ফিলিস্তিনপন্থী কার্যক্রম 'বিশ্বব্যাপী সেমিটিজম বিরোধিতার যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে, তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।'
অন্যায় গ্রেপ্তার ও আইনি লড়াই
ঘটনার সূত্রপাত চলতি বছরের ৩০ মার্চ। দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রে আইনসম্মতভাবে বসবাস করা সত্ত্বেও মার্কিন অভিবাসন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (ICE) তাকে হঠাৎ গ্রেপ্তার করে। টানা ৮০ দিনেরও বেশি সময় তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে গত জুন মাসে একটি মার্কিন ডিস্ট্রিক্ট বিচারক আইনি প্রক্রিয়া চলাকালীন তাকে জামিনে মুক্তির নির্দেশ দেন। কিন্তু গতকাল চূড়ান্ত শুনানিতে অভিবাসন আদালত তার বিরুদ্ধে বহিষ্কারাদেশ জারি করে।
আদালতের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে ইমাম সারসুর আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (AP) বলেন, 'আজকের এই সিদ্ধান্ত অত্যন্ত হতাশাজনক হলেও আমি কিছুতেই হাল ছাড়ব না। আমার মৌলিক বাকস্বাধীনতা রক্ষা করতে এবং যে দেশটিকে আমি ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে নিজের বাড়ি মনে করে আসছি, সেখানে টিকে থাকার অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমার আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে।'
ট্রাম্প প্রশাসনের ফিলিস্তিনবিরোধী নীতির ভয়াবহ রূপ
ইমাম সারসুরের এই বহিষ্কারাদেশ মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে অনুচ্ছেদ-১ এ সুরক্ষিত মৌলিক বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী। আইনজীবী ও মানবাধিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি আগ্রাসন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন মুসলিম সম্প্রদায়ের অবস্থানকে স্তব্ধ করে দিতেই এই নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।
উৎস সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের জুনে কার্যকর করা ট্রাম্প প্রশাসনের বিশেষ স্মারকের (memorandum) দোহাই দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে যেকোনো বিদেশী নাগরিকের উপস্থিতি 'মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে' বলে মনে হলেই তাকে বিতাড়ন করা সম্ভব। এর আগেও এই ধারার অপব্যবহার করে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থী মাহমুদ খলিল এবং মহসেন মাহদাবিকে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া শুরু করেছিল প্রশাসন।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, মার্কিন সরকার যেভাবে উগ্র ইসরায়েলপন্থী অবস্থান গ্রহণ করে নিজ দেশে ফিলিস্তিনের পক্ষে সত্য উচ্চারণকারী মুসলিম ব্যক্তিত্বদের টার্গেট করছে, তা বৈশ্বিক মানবাধিকার ব্যবস্থার প্রতি চরম উপহাস এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মুসলিমবিদ্বেষী নীতির মতোই এক ভীতিকর নজির।
মতামত