জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, ফ্যাসিস্টদের বিচার আগে, এরপর জাতীয় পুনর্মিলন। রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার চেষ্টার কারণেই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়েছে।
আজ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর ‘মহাসংলাপ: ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা ও জাতীয় পুনর্মিলন’ শীর্ষক সেশনে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন/গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছে এবং পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে কাজ করছে উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, 'এই সরকার অবশ্যই আইনের শাসন নিশ্চিত করবে এবং জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী গণহত্যার পেছনের অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনবে।'
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আমাদের বিচারিক ও রাজনৈতিক কাঠামোগুলোকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো শাসকগোষ্ঠীর ব্যক্তিস্বার্থ না দেখে সাধারণ নাগরিকদের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
তিনি গত ছাত্র-জনতার বিপ্লবের তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, 'বাংলাদেশে ৫ আগস্ট বা তার পূর্ববর্তী দিনগুলোতে যা ঘটেছিল, তা কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর এক মৌলিক পুনঃসংজ্ঞায়ন। বাংলাদেশের নাগরিকরা আইনের শাসনকে উপেক্ষা করা এবং নাগরিক স্বাধীনতা ও ধর্মীয়-মানবাধিকার দমন করা স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থাকে চূড়ান্তভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিল।'
তিনি আরও বলেন, 'এ দেশের আপামর জনগণ লড়াই করেছিল গণতান্ত্রিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। তারা একটি সুদৃঢ় নজির স্থাপন করতে চেয়েছিল, যাতে বাংলাদেশে আর কোনোদিন কোনো ফ্যাসিস্ট বা উগ্র শক্তি স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করার দুঃসাহস না পায়।'
৫ আগস্টের ক্ষমতাচ্যুত ও গণহত্যাকারী শাসনব্যবস্থার সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা বা পুনর্বাসনের সুযোগ নেই উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, 'তারা আমাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের অংশ হওয়ার যোগ্যতা চিরতরে হারিয়েছে। জনগণের সুরক্ষার জন্য গড়ে তোলা রাষ্ট্রযন্ত্রকে যারা পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল, তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের আপস হতে পারে না।'
বিশ্বজুড়ে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ও সাধারণ জনগণের অধিকার হরণের প্রেক্ষাপট উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'স্বৈরাচারীদের উগ্র উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে রুখে দিতে শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন। বাংলাদেশে আমরা বর্তমানে সেই নতুন ভিত্তিসমূহ গড়ে তুলছি। এ প্রক্রিয়ায় রাজপথে যে চড়া মূল্য ও রক্তের ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, সে সম্পর্কে আমরা গভীরভাবে সচেতন। আমরা এমন এক ভবিষ্যতের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যেখানে সরকার কাঠামোগতভাবেই জবাবদিহিতার আওতাভুক্ত থাকবে, যাতে স্বৈরতন্ত্রের কালো অধ্যায়গুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়।'
উল্লেখ্য, উক্ত আন্তর্জাতিক সেশনে বিচার ও জবাবদিহিতার বৈশ্বিক রূপরেখা নিয়ে অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন সাউথ এশিয়া স্টাডিজ সেন্টার (ইউনিভার্সিটি অব রাজস্থান, ভারত)-এর প্রফেসর করোরি সিং, দৈনিক নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীর, দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস ইউনিভার্সিটির গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি এবং কলম্বিয়ার সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজ-এর এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিকি সিঙ্গার।
মতামত