রাজধানীর পাঁচতারকা হোটেল ‘শেরাটন ঢাকা’-এর গ্র্যান্ড হলরুমে ৫ অক্টোবর (সোমবার) ‘এ ডিপ্লোম্যাটিক ইভনিং-২০২৬’ (A Diplomatic Evening-2026) শীর্ষক এক ঐতিহাসিক নৈশভোজ ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস। বিশ্বমঞ্চে ইসলামী রাজনৈতিক দর্শনের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি তুলে ধরতে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, ইরান, পাকিস্তানসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বহু দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক দলের ভিশন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি, সংখ্যালঘু ও নারী অধিকার এবং সার্বভৌম জাতীয় স্বার্থের পক্ষে তাদের সুদৃঢ় অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের উদ্যোগে আয়োজিত ‘এ ডিপ্লোম্যাটিক ইভনিং-২০২৬’-এ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং বাংলাদেশের অন্যতম প্র প্রভাবশালী ইসলামী রাজনৈতিক দলটির শীর্ষ নেতাদের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। অনুষ্ঠানটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে পশ্চিমা ও অন্যান্য বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তা সম্পর্কে বিদ্যমান ভুল ধারণা দূর করে একটি ইনসাফভিত্তিক ও ভারসাম্যপূর্ণ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি পেশ করা।
উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক উপস্থিতি
অনুষ্ঠানে বিশ্বজুড়ে প্রতিনিধিত্বকারী শীর্ষ কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- জার্মানি: রাষ্ট্রদূত ড. রুডিগার লটজ
- ইরান: রাষ্ট্রদূত ড. জালিল রহিমি জাহানাবাদি
- সিঙ্গাপুর: চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মি. ফিলিপ ওং
- ইরাক: চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. ওয়িসাম হুসাইন আলী আল-ইথাওয়ি
- মালদ্বীপ: ডেপুটি হাইকমিশনার মি. আলী শাহ
- ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ফার্স্ট কাউন্সেলর কামিলা পার্টিকা
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র: রাজনৈতিক কর্মকর্তা অ্যালিস কেনেডি
এছাড়াও রাশিয়া, জাপান, পাকিস্তান, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, আর্জেন্টিনা ও ব্রুনাইয়ের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কূটনৈতিক প্রতিনিধি এবং দূতাবাসের প্রতিনিধি দল এতে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক ক্বারী মাওলানা আহমদ বিন ইউসুফের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত এবং দলের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদের স্বাগতম বক্তব্যের মাধ্যমে অনুষ্ঠান সূচনা হয়। এরপর এক ভিজ্যুয়াল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রতিষ্ঠা, ইতিহাস, সামাজিক সেবা এবং রাজনৈতিক রূপরেখা উপস্থিত কূটনীতিকদের সামনে পেশ করা হয়।
স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
সমাপনী বক্তব্যে দলের আমীর মাওলানা মামুনুল হক বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে একটি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির সুনির্দিষ্ট ফ্রেমওয়ার্ক পেশ করেন। তিনি বলেন, ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মূল ভিত্তি হলো ইসলামী মূল্যবোধ ও ইনসাফ।
'আমরা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বলয় বা পরাশক্তির মুখাপেক্ষী নই। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বিশ্বাস করে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হতে হবে জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সমতার ভিত্তিতে। আমরা কোনো দেশ বা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি না, বরং আঞ্চলিক শান্তি ও বৈশ্বিক সমৃদ্ধির স্বার্থে উন্মুক্ত ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাস করি।'
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় রাখতে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, ন্যায্য বাণিজ্য এবং মানবিক সংলাপের ভিত্তিতে, কোনো রাজনৈতিক চাপ বা আধিপত্যবাদের অধীনে নয়।
সংখ্যালঘু অধিকার, নারীর মর্যাদা ও সুশাসন
ইসলামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও নারীদের অধিকারের যে সুনির্দিষ্ট আইনি নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে মাওলানা মামুনুল হক বলেন, খেলাফত মজলিসের দলীয় সনদে অমুসলিম ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সুনিশ্চিত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তিনি নারীর ন্যায্য অধিকার রক্ষা এবং সমাজের সব স্তরে তাদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় দলের অটল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
একটি ইনসাফপূর্ণ ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনে বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা এবং মুক্ত গণমাধ্যম হলো যেকোনো সুশাসিত ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রকাঠামোর প্রাণ।
অনুষ্ঠানে দলের অভিভাবক পরিষদের সদস্য মাওলানা আকরাম আলী, সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, নায়েবে আমীর মাওলানা রেজাউল করীম জালালী, মাওলানা আলী উসমান, মাওলানা আফজালুর রহমান, মাওলানা মাহবুবুল হক, মাওলানা কুরবান আলী, যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মুফতি শরাফত হোসাইন, মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজি, সংসদ সদস্য মুফতি মুহাম্মাদুল্লাহ এমপি, মাওলানা সাঈদ উদ্দীন আহমদ হানজালা, প্রকৌশলী মাহবুবা হাকীম এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুর রহমান হেলালসহ কেন্দ্রীয় ও অঙ্গসংগঠনের (যুব মজলিস, ছাত্র মজলিস, শ্রমিক মজলিস) শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মতামত