বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

আমেরিকার কর নথিপত্র ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন আরএসএস-এর সঙ্গে যুক্ত দুটি দাতব্য সংস্থা মার্কিন ডোনার-অ্যাডভাইসড ফান্ডের মাধ্যমে অন্তত ২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার সংগ্রহ করেছে।

আরএসএস-সংশ্লিষ্ট দুই দাতব্য সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড থেকে পেয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

আরএসএস-সংশ্লিষ্ট দুই দাতব্য সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড থেকে পেয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার

নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সাইট বেলিংক্যাটের একটি অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) সাথে কথিত যোগসূত্র রয়েছে এমন মার্কিন নিবন্ধিত দুটি দাতব্য সংস্থা ‘একল বিদ্যালয় ফাউন্ডেশন অফ ইউএসএ ইনক’ (একল ইউএসএ) এবং ‘সেবা ইন্টারন্যাশনাল ইনক’ (সেবা ইউএসএ) ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড (DAF) বা দাতা-পরামর্শদাতা তহবিল প্রদানকারীদের মাধ্যমে অন্তত ২৪.৪ মিলিয়ন ডলার বা ২ কোটি ৪৪ লাখ মার্কিন ডলার গ্রহণ করেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই অনুদান দেওয়া হয়। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সংস্থা দুটির পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের অনুদান প্রদান করেছিল, তাদের মার্কিন ট্যাক্স ফাইলিং বা কর বিবরণীও খতিয়ে দেখা হয়।

বেলিংক্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪টি ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এই দুই দাতব্য সংস্থা অর্থ পেয়েছে। আলোচিত পাঁচ বছরে এই সংস্থা দুটি মোট ১১ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের অনুদান ও কন্ট্রিবিউশন পেয়েছে, যার মধ্যে ২০.৭ শতাংশই এসেছে এই তহবিলগুলোর মাধ্যমে।

এই অনুসন্ধানের ভিত্তি ছিল মার্কিন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধ্যতামূলক ট্যাক্স রিটার্ন, যা ‘ফরম ৯৯০’ নামে পরিচিত। বেলিংক্যাট জানিয়েছে, ডোনার-অ্যাডভাইজড তহবিলের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ এই গবেষণার বাইরে থাকা আংশিক বছরের ফাইলিংগুলো হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল।

ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যক্তিরা কোনো মধ্যবর্তী দাতব্য সংস্থায় অর্থ জমা দিতে পারেন এবং কোন যোগ্য দাতব্য সংস্থাকে সেই অনুদান দেওয়া হবে তা সুপারিশ করতে পারেন। স্পন্সরকারী সংস্থাটি আইনগতভাবে অনুদানকৃত অর্থের নিয়ন্ত্রণ করে, অথচ জনসমক্ষে প্রকাশিত অনুদানের রেকর্ডে মূল দাতার পরিচয় গোপন থাকতে পারে।

একল ইউএসএ-এর তহবিল ও কার্যক্রম

বেলিংক্যাটের তথ্যমতে, একল ইউএসএ ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৮৩ লাখ ডলার এসেছে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড প্রদানকারীদের মাধ্যমে।

তাদের ট্যাক্স ফাইলিং অনুযায়ী, এই সময়ে বিদেশে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার অনুদান পাঠানো হয়েছে, যার পুরোটাই ভারতে ‘একল বিদ্যালয় প্রকল্প’-এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই পাঁচ বছরে অন্যান্য কোনো সংস্থা বা ব্যক্তিকে তারা কোনো অভ্যন্তরীণ (domestic) অনুদান দেয়নি।

একল ইউএসএ তাদের লক্ষ্য হিসেবে গ্রামীণ ও দুর্গম ভারতের শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কথা বলে থাকে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে একল বিদ্যালয় উদ্যোগের সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য এর মার্কিন শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বেলিংক্যাট এই সংস্থার শেকড় খুঁজে পায় ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অব আমেরিকা’ (VHPA)-র সাথে। ভিএইচপিএ-র মুখপাত্র শ্যাম তিওয়ারি বেলিংক্যাটকে জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে একল ইউএসএ তাদেরই একটি প্রোগ্রাম হিসেবে শুরু হয়েছিল এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে এটি স্বাধীন সত্তা লাভ করে।

প্রতিবেদনে একল বিদ্যালয় আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের বিদ্যালয়গুলোতে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও নারীদের মাঝে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ প্রচার করা হয় এবং মুসলমান ও খ্রিস্টানদের হিন্দুধর্মের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

এসব অভিযোগ এবং আরএসএস-এর সাথে সম্পর্ক নিয়ে বেলিংক্যাটের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি একল ইউএসএ। তবে তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলীতে (FAQ) বলা হয়েছে যে, তারা স্কুলে কোনো ধর্মশিক্ষা দেয় না এবং 'বর্ণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করে না'।

সেবা ইউএসএ: আরএসএস সংযোগ অস্বীকার

বেলিংক্যাটের তথ্য অনুযায়ী, সেবা ইউএসএ ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের অনুদান পেয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার এসেছে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড থেকে।

তাদের ট্যাক্স নথিতে দক্ষিণ এশিয়ার সংস্থোগুলোতে ২ কোটি ৯৭ লাখ ডলার বৈদেশিক অনুদান এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ ২২ হাজার ৬১৩ ডলার অভ্যন্তরীণ অনুদান দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তবে সেবা ইউএসএ ভারত-ভিত্তিক সংস্থা ‘সেবা ভারতী’কে (যাকে বেলিংক্যাট আরএসএস-এর সমর্থনপুষ্ট বলে উল্লেখ করেছে) কত টাকা পাঠিয়েছে, ট্যাক্স ফাইলিংয়ে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

সেবা ইউএসএ নিজেদের একটি 'হিন্দু ধর্মভিত্তিক, মানবতাবাদী, অলাভজনক সেবা সংস্থা' হিসেবে পরিচয় দেয়। এটি ভারত-ভিত্তিক সেবা ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটের সেবা মুভমেন্টের অধীনেও তালিকাভুক্ত রয়েছে।

সেবা ইউএসএ-এর পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাখি ইসরানি ইমেইলে বেলিংক্যাটকে জানিয়েছেন যে, সংস্থাটি 'আরএসএস-এর কোনো শাখা বা সহযোগী হিসেবে কাজ করে না' এবং কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না।

ভারতের অংশীদার সংস্থাগুলোতে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে ইসরানি বলেন, 'সেবা ভারতীর মতো সেবা-ভিত্তিক এনজিওসহ ভারতের অংশীদার সংস্থাগুলোতে দেওয়া বৈদেশিক অনুদান কঠোরভাবে প্রকল্পভিত্তিক, সম্পূর্ণ অডিটকৃত এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ত্রাণে পরিমাপযোগ্য মানবতাবাদী প্রভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয়'। তিনি আরও জানান, সেবা ভারতীর পরিচালনা বা কার্যক্রমে সেবা ইউএসএ-এর কোনো ভূমিকা নেই।

তবে অনুসন্ধানে সেবা ইউএসএ-এর প্রকাশিত বিভিন্ন উপকরণের উদ্ধৃতি দিয়ে আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সেবা ইউএসএ সেবা ভারতীকে তাদের 'বোন অর্গানাইজেশন বা ভগিনী সংগঠন' হিসেবে বর্ণনা করেছিল। এছাড়া ২০২২ সালের একটি ফেসবুক পোস্টে তারা সেবা ভারতীর পূর্বাঞ্চলীয় শাখাকে 'অংশীদার সংস্থা' বলে উল্লেখ করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালে সেবা ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বেদ প্রকাশ নন্দার মৃত্যুর পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল যে তিনি 'আরএসএস-এর আদর্শে গভীরভাবে নিমজ্জিত ছিলেন'। এছাড়া আরএসএস-এর ওয়েবসাইটে সেবা ভারতীর লিংক রয়েছে এবং ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে তাদের সেবা বিভাগের অধীনে এই সংস্থাকে দেখানো হয়েছে। সেবা ভারতী একাধিকবার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে বেলিংক্যাট।

অনুদানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

এই দুই দাতব্য সংস্থায় অর্থ প্রেরণে মধ্যস্বত্বভোগী ফান্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখেছে এই অনুসন্ধান। বেলিংক্যাট কর্তৃক চিহ্নিত শীর্ষ তিনটি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হলো—ফিডেলিটি চ্যারিটেবল (Fidelity Charitable), আমেরিকান অনলাইন গিভিং ফাউন্ডেশন (American Online Giving Foundation) এবং ডিএএফগিভিং৩৬০ (DAFgiving360), যা পূর্বে সোয়াব চ্যারিটেবল নামে পরিচিত ছিল। এই তিন প্রতিষ্ঠান আলোচ্য সময়ে দুই দাতব্য সংস্থাকে দেওয়া ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড অনুদানের প্রায় ২ কোটি ডলার বা ৮১.৭ শতাংশের জোগান দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তিন প্রদানকারী সংস্থাই অলাভজনক সংস্থাগুলো মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকার দাবি করেছে। ফিডেলিটি চ্যারিটেবল নিজেদের একটি 'কজ-নিউট্রাল' বা উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ দাতব্য সংস্থা হিসেবে বর্ণনা করে জানায় যে তারা অনুদানগুলো দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করে। আমেরিকান অনলাইন গিভিং ফাউন্ডেশন ঘৃণা ছড়ানোমূলক বক্তব্য (hate speech), বৈষম্য এবং তহবিলের অপব্যবহার রোধে যোগ্যতার মাপকাঠির কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ডিএএফগিভিং৩৬০ জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বা সাময়িকভাবে অনুদান স্থগিত করা হতে পারে।

আইনজীবীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড স্পন্সররা প্রাইভেট ফাউন্ডেশনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের নজরদারির মুখে পড়ে, কারণ তাদের পাবলিক চ্যারিটি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

বেলিংক্যাটের এই অনুসন্ধানে ট্যাক্স নথিতে থাকা রিপোর্টের অঙ্ক ও অনুদানের পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে সরাসরি এটি প্রমাণ হয় না যে মূল দাতারা নিজেরা সরাসরি আরএসএস-কে অর্থায়ন করার উদ্দেশ্যে এই অনুদান দিয়েছিলেন। মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত দাতব্য তহবিলের স্বচ্ছতা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত প্রবক্তা বা সহযোগী প্রকল্প পরিচালিত দাতাদের কার্যক্রম নিয়ে চলমান প্রশ্ন ও বিতর্কের মাঝেই এই চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান প্রকাশিত হলো।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত আরএসএস

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬


আরএসএস-সংশ্লিষ্ট দুই দাতব্য সংস্থা যুক্তরাষ্ট্রে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড থেকে পেয়েছে ২ কোটি ৪৪ লাখ ডলার

প্রকাশের তারিখ : ২১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সাইট বেলিংক্যাটের একটি অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) সাথে কথিত যোগসূত্র রয়েছে এমন মার্কিন নিবন্ধিত দুটি দাতব্য সংস্থা ‘একল বিদ্যালয় ফাউন্ডেশন অফ ইউএসএ ইনক’ (একল ইউএসএ) এবং ‘সেবা ইন্টারন্যাশনাল ইনক’ (সেবা ইউএসএ) ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড (DAF) বা দাতা-পরামর্শদাতা তহবিল প্রদানকারীদের মাধ্যমে অন্তত ২৪.৪ মিলিয়ন ডলার বা ২ কোটি ৪৪ লাখ মার্কিন ডলার গ্রহণ করেছে। ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই অনুদান দেওয়া হয়। চলতি মাসের শুরুতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে সংস্থা দুটির পাশাপাশি যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের অনুদান প্রদান করেছিল, তাদের মার্কিন ট্যাক্স ফাইলিং বা কর বিবরণীও খতিয়ে দেখা হয়।

বেলিংক্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪টি ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান থেকে এই দুই দাতব্য সংস্থা অর্থ পেয়েছে। আলোচিত পাঁচ বছরে এই সংস্থা দুটি মোট ১১ কোটি ৭৮ লাখ ডলারের অনুদান ও কন্ট্রিবিউশন পেয়েছে, যার মধ্যে ২০.৭ শতাংশই এসেছে এই তহবিলগুলোর মাধ্যমে।

এই অনুসন্ধানের ভিত্তি ছিল মার্কিন অলাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধ্যতামূলক ট্যাক্স রিটার্ন, যা ‘ফরম ৯৯০’ নামে পরিচিত। বেলিংক্যাট জানিয়েছে, ডোনার-অ্যাডভাইজড তহবিলের মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রকৃত অর্থের পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে, কারণ এই গবেষণার বাইরে থাকা আংশিক বছরের ফাইলিংগুলো হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল।

ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে ব্যক্তিরা কোনো মধ্যবর্তী দাতব্য সংস্থায় অর্থ জমা দিতে পারেন এবং কোন যোগ্য দাতব্য সংস্থাকে সেই অনুদান দেওয়া হবে তা সুপারিশ করতে পারেন। স্পন্সরকারী সংস্থাটি আইনগতভাবে অনুদানকৃত অর্থের নিয়ন্ত্রণ করে, অথচ জনসমক্ষে প্রকাশিত অনুদানের রেকর্ডে মূল দাতার পরিচয় গোপন থাকতে পারে।

একল ইউএসএ-এর তহবিল ও কার্যক্রম

বেলিংক্যাটের তথ্যমতে, একল ইউএসএ ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের বেশি অনুদান পেয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৮৩ লাখ ডলার এসেছে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড প্রদানকারীদের মাধ্যমে।

তাদের ট্যাক্স ফাইলিং অনুযায়ী, এই সময়ে বিদেশে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ডলার অনুদান পাঠানো হয়েছে, যার পুরোটাই ভারতে ‘একল বিদ্যালয় প্রকল্প’-এর পেছনে ব্যয় করা হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তবে ওই পাঁচ বছরে অন্যান্য কোনো সংস্থা বা ব্যক্তিকে তারা কোনো অভ্যন্তরীণ (domestic) অনুদান দেয়নি।

একল ইউএসএ তাদের লক্ষ্য হিসেবে গ্রামীণ ও দুর্গম ভারতের শিশুদের বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের কথা বলে থাকে। ২০০০ সালের শুরুর দিকে একল বিদ্যালয় উদ্যোগের সম্প্রসারণে সহায়তার জন্য এর মার্কিন শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

বেলিংক্যাট এই সংস্থার শেকড় খুঁজে পায় ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ অব আমেরিকা’ (VHPA)-র সাথে। ভিএইচপিএ-র মুখপাত্র শ্যাম তিওয়ারি বেলিংক্যাটকে জানান, ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে একল ইউএসএ তাদেরই একটি প্রোগ্রাম হিসেবে শুরু হয়েছিল এবং ২০০০ সালের শুরুর দিকে এটি স্বাধীন সত্তা লাভ করে।

প্রতিবেদনে একল বিদ্যালয় আন্দোলন নিয়ে বিভিন্ন সমালোচনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, তাদের বিদ্যালয়গুলোতে সুবিধাবঞ্চিত শিশু ও নারীদের মাঝে উগ্র হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শ প্রচার করা হয় এবং মুসলমান ও খ্রিস্টানদের হিন্দুধর্মের শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা হয়।

এসব অভিযোগ এবং আরএসএস-এর সাথে সম্পর্ক নিয়ে বেলিংক্যাটের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি একল ইউএসএ। তবে তাদের অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলীতে (FAQ) বলা হয়েছে যে, তারা স্কুলে কোনো ধর্মশিক্ষা দেয় না এবং 'বর্ণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি বা ভাষাগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করে না'।

সেবা ইউএসএ: আরএসএস সংযোগ অস্বীকার

বেলিংক্যাটের তথ্য অনুযায়ী, সেবা ইউএসএ ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৯৪ লাখ ডলারের অনুদান পেয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার এসেছে ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড থেকে।

তাদের ট্যাক্স নথিতে দক্ষিণ এশিয়ার সংস্থোগুলোতে ২ কোটি ৯৭ লাখ ডলার বৈদেশিক অনুদান এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ ২২ হাজার ৬১৩ ডলার অভ্যন্তরীণ অনুদান দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে। তবে সেবা ইউএসএ ভারত-ভিত্তিক সংস্থা ‘সেবা ভারতী’কে (যাকে বেলিংক্যাট আরএসএস-এর সমর্থনপুষ্ট বলে উল্লেখ করেছে) কত টাকা পাঠিয়েছে, ট্যাক্স ফাইলিংয়ে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।

সেবা ইউএসএ নিজেদের একটি 'হিন্দু ধর্মভিত্তিক, মানবতাবাদী, অলাভজনক সেবা সংস্থা' হিসেবে পরিচয় দেয়। এটি ভারত-ভিত্তিক সেবা ইন্টারন্যাশনালের ওয়েবসাইটের সেবা মুভমেন্টের অধীনেও তালিকাভুক্ত রয়েছে।

সেবা ইউএসএ-এর পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট রাখি ইসরানি ইমেইলে বেলিংক্যাটকে জানিয়েছেন যে, সংস্থাটি 'আরএসএস-এর কোনো শাখা বা সহযোগী হিসেবে কাজ করে না' এবং কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে না।

ভারতের অংশীদার সংস্থাগুলোতে অনুদান দেওয়ার বিষয়ে ইসরানি বলেন, 'সেবা ভারতীর মতো সেবা-ভিত্তিক এনজিওসহ ভারতের অংশীদার সংস্থাগুলোতে দেওয়া বৈদেশিক অনুদান কঠোরভাবে প্রকল্পভিত্তিক, সম্পূর্ণ অডিটকৃত এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ত্রাণে পরিমাপযোগ্য মানবতাবাদী প্রভাবের ভিত্তিতে মূল্যায়িত হয়'। তিনি আরও জানান, সেবা ভারতীর পরিচালনা বা কার্যক্রমে সেবা ইউএসএ-এর কোনো ভূমিকা নেই।

তবে অনুসন্ধানে সেবা ইউএসএ-এর প্রকাশিত বিভিন্ন উপকরণের উদ্ধৃতি দিয়ে আরএসএস-সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সাথে তাদের যোগাযোগের প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৪ সালের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে সেবা ইউএসএ সেবা ভারতীকে তাদের 'বোন অর্গানাইজেশন বা ভগিনী সংগঠন' হিসেবে বর্ণনা করেছিল। এছাড়া ২০২২ সালের একটি ফেসবুক পোস্টে তারা সেবা ভারতীর পূর্বাঞ্চলীয় শাখাকে 'অংশীদার সংস্থা' বলে উল্লেখ করে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ২০২৩ সালে সেবা ইউএসএ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বেদ প্রকাশ নন্দার মৃত্যুর পর প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছিল যে তিনি 'আরএসএস-এর আদর্শে গভীরভাবে নিমজ্জিত ছিলেন'। এছাড়া আরএসএস-এর ওয়েবসাইটে সেবা ভারতীর লিংক রয়েছে এবং ২০১৬ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে তাদের সেবা বিভাগের অধীনে এই সংস্থাকে দেখানো হয়েছে। সেবা ভারতী একাধিকবার মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি বলে জানিয়েছে বেলিংক্যাট।

অনুদানের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

এই দুই দাতব্য সংস্থায় অর্থ প্রেরণে মধ্যস্বত্বভোগী ফান্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকাও খতিয়ে দেখেছে এই অনুসন্ধান। বেলিংক্যাট কর্তৃক চিহ্নিত শীর্ষ তিনটি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হলো—ফিডেলিটি চ্যারিটেবল (Fidelity Charitable), আমেরিকান অনলাইন গিভিং ফাউন্ডেশন (American Online Giving Foundation) এবং ডিএএফগিভিং৩৬০ (DAFgiving360), যা পূর্বে সোয়াব চ্যারিটেবল নামে পরিচিত ছিল। এই তিন প্রতিষ্ঠান আলোচ্য সময়ে দুই দাতব্য সংস্থাকে দেওয়া ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড অনুদানের প্রায় ২ কোটি ডলার বা ৮১.৭ শতাংশের জোগান দিয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই তিন প্রদানকারী সংস্থাই অলাভজনক সংস্থাগুলো মূল্যায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকার দাবি করেছে। ফিডেলিটি চ্যারিটেবল নিজেদের একটি 'কজ-নিউট্রাল' বা উদ্দেশ্য-নিরপেক্ষ দাতব্য সংস্থা হিসেবে বর্ণনা করে জানায় যে তারা অনুদানগুলো দাতব্য উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করে। আমেরিকান অনলাইন গিভিং ফাউন্ডেশন ঘৃণা ছড়ানোমূলক বক্তব্য (hate speech), বৈষম্য এবং তহবিলের অপব্যবহার রোধে যোগ্যতার মাপকাঠির কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে ডিএএফগিভিং৩৬০ জানিয়েছে, পরিস্থিতি অনুযায়ী গ্রহীতাদের ওপর নজরদারি বা সাময়িকভাবে অনুদান স্থগিত করা হতে পারে।

আইনজীবীদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডোনার-অ্যাডভাইজড ফান্ড স্পন্সররা প্রাইভেট ফাউন্ডেশনের তুলনায় ভিন্ন ধরনের নজরদারির মুখে পড়ে, কারণ তাদের পাবলিক চ্যারিটি হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করা হয়।

বেলিংক্যাটের এই অনুসন্ধানে ট্যাক্স নথিতে থাকা রিপোর্টের অঙ্ক ও অনুদানের পথ চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এর মাধ্যমে সরাসরি এটি প্রমাণ হয় না যে মূল দাতারা নিজেরা সরাসরি আরএসএস-কে অর্থায়ন করার উদ্দেশ্যে এই অনুদান দিয়েছিলেন। মধ্যস্বত্বভোগী সংস্থার মাধ্যমে প্রবাহিত দাতব্য তহবিলের স্বচ্ছতা এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত প্রবক্তা বা সহযোগী প্রকল্প পরিচালিত দাতাদের কার্যক্রম নিয়ে চলমান প্রশ্ন ও বিতর্কের মাঝেই এই চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধান প্রকাশিত হলো।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ