ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির ঐতিহাসিক রেস কোর্স এলাকায় বিজেপি পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানে সাত শতাধিক মুসলিম পরিবারকে তাদের দীর্ঘদিনের বসতভিটা থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। উপযুক্ত পুনর্বাসন ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করেই এই বিধ্বংসী বুলডোজার চালানো হয়, যার ফলে শত শত শিশু, নারী ও বৃদ্ধ খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। বছরের পর বছর ধরে এখানে বসবাসকারী এ সকল মানুষ তাদের জীবন-জীবিকার জন্য পার্শ্ববর্তী এলাকার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন।
এই নির্মম ঘটনার তীব্র সমালোচনা করে কংগ্রেসের রাজ্যসভা এমপি নাসির হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) বলেন, 'বুলডোজার চালিয়ে ৭০০-রও বেশি পরিবারের মাথা গোঁজার ঠাঁই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আজ তারা চরম অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যতের উদ্বেগের মুখে পড়েছে। মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে এভাবে মানুষের ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া বিজেপি সরকারের এক চরম ও গুরুতর ব্যর্থতা।' তিনি অনতিবিলম্বে দিল্লি সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণ ও সম্মানজনক পুনর্বাসনের দাবি জানান।
ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। নেটিজেনরা বিজেপি সরকারের এই পদক্ষেপকে 'মুসলিমবিদ্বেষী এজেন্ডা' বলে অভিহিত করেছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, 'দিল্লির হৃদয়স্থলে এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখে মনে হয় আজ মানবতা ও বিচার ব্যবস্থার মৃত্যু ঘটেছে। তাদের একমাত্র অপরাধ তারা মুসলিম, তাই তাদের সাথে এই অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।' অপর একজন ব্যবহারকারী প্রশ্ন তোলেন, 'মোদি সরকারের চোখে মুসলিমদের জীবন ও তাদের উপাসনালয়ের কোনো মূল্য নেই। শত শত পরিবারকে গৃহহীন করার পর এদের ভবিষ্যৎ ও পুনর্বাসনের দায় কে নেবে?'
অন্যদিকে, চলমান উচ্ছেদ অভিযানের মাঝেই শতাব্দীর পুরোনো ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদ উচ্ছেদের ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। মসজিদটির ইমাম মুহাম্মদ হারুন জানান, স্থানীয় প্রশাসন ইতিমধ্যেই মসজিদের বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এবং আগামী ৬ দিনের মধ্যে মসজিদ প্রাঙ্গণ খালি করার চূড়ান্ত নোটিশ দিয়েছে।
ঐতিহাসিক মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থান রক্ষায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জম্মু-কাশ্মীরের সর্বদলীয় হুররিয়ত কনফারেন্সের চেয়ারম্যান মীরওয়াইজ ওমর ফারুক এবং সর্বভারতীয় মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (AIMIM) প্রধান আসাদুদ্দিন ওয়াইসি। তারা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে মুসলিম স্থাপত্য ও উপাসনালয় সুরক্ষার আহ্বান জানান। ইতোমধ্যে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিষেন রেড্ডির (Kiren Rijiju) সাথে যোগাযোগ করে মসজিদ ও কবরস্থান রক্ষা এবং অবিলম্বে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বহালের দাবি জানিয়েছে।
তবে দিল্লি পুলিশের তুঘলক রোড থানার এক কর্মকর্তা জিয়াসত ডেইলিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন যে, কোনো মসজিদ বা মন্দির ভাঙা হয়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা বলেন, উচ্ছেদকৃত অধিবাসীদের এলাকা থেকে সরিয়ে প্রায় ১৫-১৬ কিলোমিটার দূরে মুণ্ডকা (Mundka) নামক স্থানে বিকল্প আবাসনের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অভিযোগ, মূল শহর থেকে দূরে কোনো স্পষ্ট অবকাঠামো ছাড়াই তাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই সম্মানজনক বা পর্যাপ্ত পুনর্বাসন নয়।
মতামত