কানাডার ক্যালগেরি অপেরা নিশ্চিত করেছে যে, গিয়াকোমো পুচ্চিনির বিখ্যাত অপেরা ‘টোস্কা’-র বাকি প্রদর্শনীগুলোতে ‘সিজারে অ্যাঞ্জেলোটি’ চরিত্রে সানচেজ-অরটেগার পরিবর্তে অন্য একজন শিল্পী পারফর্ম করবেন। নাটকটির এই চরিত্রটি রোমের রাজনৈতিক অস্থিরতার পটভূমিতে নির্মিত এবং একজন পলাতক রাজনৈতিক বন্দির জীবনের ওপর আবর্তিত।
গত রবিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ক্যালগেরি অপেরা এই পতাকা প্রদর্শনকে 'অপ্রত্যাশিত ও অননুমোদিত' বলে অভিহিত করেছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিবাদ কোম্পানির নীতিমালার পরিপন্থী এবং 'একটি সংযুক্ত, যত্নশীল ও সুশীল সমাজ গঠনে যৌথ শৈল্পিক অভিজ্ঞতার' যে দায়িত্ব তাদের রয়েছে, তার সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, জুবিলি অডিটোরিয়ামে উপস্থিত দর্শক, পারফর্মার, কলাকুশলী, অর্কেস্ট্রার সংগীতশিল্পীরা এবং কর্মীরা এই ঘটনায় ভিন্নভাবে প্রভাবিত হতে পারেন। এর ফলে যে 'অস্বস্তি ও দুশ্চিন্তা' তৈরি হয়েছে, সে জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে। তারা আরও জানায় যে, বিষয়টি নিয়ে সানচেজ-অরটেগার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করা হয়েছে এবং কাস্ট ও প্রোডাকশন টিমের জন্য কোম্পানির প্রত্যাশাগুলো আরও স্পষ্ট করা হয়েছে।
শিল্পী কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি
বহিষ্কারের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক বিবৃতিতে সানচেজ-অরটেগা নিশ্চিত করেছেন যে তিনি আর মঞ্চে ফিরবেন না।
তিনি লেখেন, 'ক্যালগেরি অপেরার সঙ্গে ‘টোস্কা’ নাটকের পরবর্তী প্রদর্শনীগুলো থেকে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। উদ্বোধনী রাতে কুর্টিন কলের সময় ফিলিস্তিনের পতাকা প্রদর্শন করার পর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ নিয়ে আমার কোনো অনুশোচনা নেই।'
এই গায়ক আরও অভিযোগ করেন যে ক্যালগেরি অপেরার ওপর আর্থিক হুমকি দেওয়া হয়েছিল, যদিও তিনি তার বিবৃতিতে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য দেননি। এই অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বহিষ্কারের পরও কোম্পানির প্রতি কোনো ক্ষোভ নেই বলে জানান সানচেজ-অরটেগা। তিনি যোগ করেন, 'নাটক বা থিয়েটারের পর্দা নামার পর (রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক) আমাদের সবাইকে নিজ ঘরে ফিরতে হয় এবং আয়নায় নিজেদের মুখের দিকে তাকাতে হয়।'
পলাতক রাজনৈতিক বন্দি অ্যাঞ্জেলোটির চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলতে পারা তার জন্য অত্যন্ত সম্মানের ছিল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা ও প্রতিক্রিয়া
শিল্পীর এই বহিষ্কারাদেশ ফিলিস্তিনপন্থী সমর্থকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। তারা বলছেন, ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সংহতি প্রকাশ করায় শিল্পীদের কোনোভাবেই পেশাগত পরিণতির মুখে ফেলা উচিত নয়।
‘কানাডিয়ানস ফর জাস্টিস অ্যান্ড পিস ইন দ্য মিডল ইস্ট’ (CJPME) এক বিবৃতিতে সানচেজ-অরটেগার অপসারণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ক্যালগেরি অপেরাকে তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার আহ্বান জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'শিল্প সবসময়ই রাজনৈতিক, এবং ফিলিস্তিনির জনগণ যখন একটি গণহত্যার মুখোমুখি, তখন তাদের প্রতি সমর্থন জানানোর জন্য শিল্পীদের শাস্তি দেওয়া উচিত নয়।'
এই বিরোধের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশনার সময় রাজনৈতিক অভিব্যক্তির ওপর যে ধরনের সীমানা নির্ধারণ করে থাকে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, শৈল্পিক ও মানবিক সংকটের সাথে শিল্পীদের সম্পৃক্ত হওয়ার স্বাধীনতার সাথে এই ধরনের বিধিনিষেধ আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
ফিলিস্তিন ও শিল্পকলা নিয়ে বিস্তৃত বিতর্ক
ক্যালগেরির এই ঘটনাটি মূলত গত বছরের একটি ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে লন্ডনের রয়্যাল অপেরা হাউসে ‘ইল ত্রোভাতোরে’ নাটকের প্রদর্শনী শেষে কুর্টিন কলের সময় এক শিল্পী ফিলিস্তিনি পতাকা প্রদর্শন করেছিলেন।
সে সময় রয়্যাল ব্যালে অ্যান্ড অপেরা ওই প্রদর্শনটিকে কুর্টিন কলের জন্য অনুপযুক্ত এবং একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও অননুমোদিত পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছিল।
ক্যালগেরি অপেরার ‘টোস্কা’ নাটকটি আগামী ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত সাউদার্ন অ্যালবার্টা জুবিলি অডিটোরিয়ামে মঞ্চস্থ হওয়ার কথা রয়েছে। কোম্পানি জানিয়েছে, বাকি শোতে সানচেজ-অরটেগার চরিত্রটিতে অন্য একজন শিল্পী অভিনয় করবেন।
কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান হলো—পতাকা প্রদর্শন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক প্রতিবাদের নীতি লঙ্ঘন করেছে। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, ফিলিস্তিনপন্থীদের প্রতি সমর্থন প্রকাশের কারণে একজন গায়ককে অপসারণ করা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানে ফিলিস্তিনপন্থীদের অধিকারের ওপর মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে।
মতামত