ভারতের গুজরাট রাজ্যের তাপি জেলার সোংগড় শহরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে ঘটা সংঘাতের পর পুলিশ প্রায় ৯ জন মুসলিম যুবককে হাত ও শরীর রশিতে বেঁধে সোংগড়ের বিভিন্ন রাস্তা দিয়ে হেঁটে নিয়ে যায়।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২০ অক্টোবর সোংগড় শহরে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নবরাত্রি ও গরবা উৎসব সম্পর্কিত ইনস্টাগ্রামের একটি রিল ও সামাজিক মাধ্যমের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। বাকুলভাই দায়ারামভাই চৌধুরী নামের স্থানীয় এক ব্যক্তির অভিযোগ অনুযায়ী, তার ছেলের করা একটি মন্তব্যের জেরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগার অভিযোগ ওঠে। পরবর্তীতে ওই কমেন্ট ডিলিট করা হলেও ২০ অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে ২০ থেকে ২৫ জনের একটি উগ্র জনতা বাকুলভাইয়ের বাড়িতে চড়াও হয় এবং ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং সোংগড়ের এসপি ঋষভ গর্গসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এলাকা পরিদর্শন করেন।
১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার
এই ঘটনায় পুলিশ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রায় ২৫ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা (আইপিসি/বিএনএস ধারা ১০৯(১)), বেআইনি সমাবেশ ও দাঙ্গার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, এ পর্যন্ত একজন অপ্রাপ্তবয়স্কসহ মোট ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত প্রাপ্তবয়স্ক ৯ জন মুসলিম যুবককে কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে সোংগড় থানায় নিয়ে যাওয়ার সময় তাদের শরীরে রশি বেঁধে পায়ে হাঁটিয়ে জনসমক্ষে ঘোরানো হয়।
বিচারিক নির্দেশনার অবমাননা ও আদালতের পূর্বের কড়া অবস্থান
আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই আসামিদের প্রকাশ্য সড়কে রশিতে বেঁধে অপমান করার এই সংস্কৃতি গুজরাটে নতুন নয়।
এছাড়া, এর আগে গরবা অনুষ্ঠানে হামলার অভিযোগে আটক মুসলিম যুবকদের খুঁটির সঙ্গে রশিতে বেঁধে প্রকাশ্যে মারধরের ঘটনায় গুজরাট পুলিশকে তীব্র ভর্ৎসনা করেছিল ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানতে চেয়েছিল যে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মানুষজনকে খুঁটিতে বেঁধে মারধর করার একচ্ছত্র অধিকার পুলিশকে কে দিয়েছে?
উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের চাপ
ঘটনার পর সোংগড় থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন। প্রতিনিধিিলেশ চন্দ্রাতেসহ কট্টরপন্থী নেতারা ভিডিও ফুটেজ পরীক্ষা করে অভিযুক্তদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত অবৈধ স্থাপনা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বুলডোজার বা ভাঙচুরের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। যদিও স্থানীয়ভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য সোংগড় বনধের ডাক দেওয়া হয়েছিল, পরবর্তীতে প্রশাসনের আশ্বাসে সেই কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
বিচারবহির্ভূত উপায়ে অভিযুক্তদের জনসমক্ষে অপমান করা এবং একপক্ষীয়ভাবে উগ্রবাদী তোষণমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের এই প্রবণতা ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের মৌলিক ভিত্তিকে মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে ফেলছে।
মতামত