মহারাষ্ট্রের নন্দুরবার জেলার এক প্রান্তিক শহর শাহাদার সন্তান প্রফেসর রিয়াজ জাফর সাঈদ বিশ্বমানের গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক অবদানের ক্ষেত্রে আবারও আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি লাভ করেছেন। বিশ্বের শীর্ষ ১,০০০ গবেষকের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং তালিকা অনুযায়ী তিনি দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছেন। শিক্ষা ও গবেষণায় মুসলিম সম্প্রদায়ের অবহেলিত ও প্রান্তিক অবস্থান কাটিয়ে কীভাবে বিশ্ব জয় করা যায়, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছেন এই বিজ্ঞানী।
সাধারণ সূচনা থেকে অসাধারণ উচ্চতায়
প্রফেসর সাঈদের এই অর্জন কোনো সাধারণ বিষয় নয়; এটি বহু বছরের কঠোর পরিশ্রম ও সাধনার ফসল। একটি অত্যন্ত সাধারণ মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রিয়াজের শৈশব কেটেছে চরম প্রতিকূলতায়। তার বাবা ছিলেন একজন সাধারণ ট্রাকচালক এবং মা পড়ালেখা করেছিলেন মাত্র সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা হয়েছিল স্থানীয় একটি পৌরসভা পরিচালিত উর্দুমধ্যম স্কুলে। চরম সামাজিক ও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও পড়ালেখার প্রতি তার ব্যাকুলতা তাকে থামতে দেয়নি।
উর্দুমধ্যম স্কুল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা শেষ করার পর, রিয়াজ সাঈদ ১৯৯৪ সালে জলগাঁওয়ের উত্তর মহারাষ্ট্র বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে স্নাতকোত্তর এবং ২০০৩ সালে অণুজীববিজ্ঞানে (Microbiology) পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তার পিএইচডি গবেষণার মূল বিষয় ছিল উদ্ভিদ ও অণুজীবের পারস্পরিক সম্পর্ক (Plant-microbe interactions)।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা
প্রফেসর সাঈদ দীর্ঘ সময় ভারতের শাহাদায় অবস্থিত পূজ্য সানে গুরুজি বিদ্যা প্রসারক মণ্ডলের আর্টস, সায়েন্স অ্যান্ড কমার্স কলেজে শিক্ষকতা ও গবেষণায় যুক্ত ছিলেন। সেখানে তিনি অণুজীববিজ্ঞান ও বায়োটেকনোলজি বিভাগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি ওমানের নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানের অঙ্গনে মুসলিম বিশ্বের অবদানকে পুনরুজ্জীবিত করছেন।
তার আন্তর্জাতিক অর্জনের তালিকা বেশ দীর্ঘ। ওমানের নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত তথ্যানুসারে, বিশ্ববিখ্যাত অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা এলসেভিয়ার (Elsevier) পরপর তিন বছর তাকে বিশ্বের শীর্ষ ২ শতাংশ সর্বাধিক উদ্ধৃত গবেষকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। এছাড়া, আন্তর্জাতিক গবেষণা পর্যালোচক সংস্থা ক্ল্যারিভেট (Clarivate) বিশ্বজুড়ে ৮,৮৬৬ জন শীর্ষ গবেষকের মধ্য থেকে তাকে সেরা ১ শতাংশের (Highly Cited Researchers) মধ্যে স্থান দিয়েছে।
বৈশ্বিক একাডেমিয়া ও গবেষণায় অবদান
পড়াশোনা ও গবেষণার কাজে প্রফেসর সাঈদ বিশ্বভ্রমণ করেছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তিনি আমন্ত্রিত বক্তা (Invited Speaker) হিসেবে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। তিনি মালয়েশিয়ার আইএনটিআই (INTI) আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং স্কলার হিসেবে কাজ করেছেন এবং উজবেকিস্তানের সায়েন্স একাডেমি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাশান সায়েন্স ফাউন্ডেশনের সঙ্গেও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা সহযোগিতা বজায় রেখেছেন। এছাড়াও সৌদি আরবের কাসিম ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞ পরামর্শক (Expert Consultant) হিসেবেও তিনি সেবা দিয়েছেন।
গবেষণা ও অর্জন
প্রফেসর সাঈদের গবেষণার মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে:
অণুজীববিজ্ঞান ও পরিবেশগত অণুজীববিজ্ঞান (Environmental Microbiology)
বায়োটেকনোলজি ও ফাইটোপ্যাথোলজি (Phytopathology)
মাটির স্বাস্থ্য ও জৈব সার (Biofertilisers)
টেকসই কৃষি ও পরিবেশ দূষণ হ্রাসের জৈবিক পদ্ধতি
তার গবেষণার পরিমাণ ও মান আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সমাজে অত্যন্ত উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ। তিনি এখন পর্যন্ত ৪১৭টিরও বেশি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রবন্ধ, ৩৬টি বই এবং ৮৫টি গবেষণা নিবন্ধ (Book Chapters) প্রকাশ করেছেন। স্প্রিঙ্গার (Springer), এলসেভিয়ার (Elsevier), ওয়াইলি (Wiley) এবং সিআরসি প্রেস (CRC Press)-এর মতো বিশ্বসেরা অ্যাকাডেমিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে তার বই ও প্রবন্ধগুলো প্রকাশিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্ল্যাটফর্ম সায়েন্সডাইরেক্ট (ScienceDirect)-এ তার ৩৩৭টি নিবন্ধ তালিকাভুক্ত রয়েছে, যা বিশ্বজুড়ে ১৩,৬৫৯ বার অন্যান্য বিজ্ঞানীদের দ্বারা উদ্ধৃত (Citations) হয়েছে এবং তার এইচ-ইনডেক্স (h-index) হলো ৫৭। পাশাপাশি রিসার্চগেট (ResearchGate)-এও তার শত শত আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা ও রেফারেন্স সংরক্ষিত রয়েছে।
উর্দুমধ্যম স্কুলের গণ্ডি ও দারিদ্র্যের বাধা পেরিয়ে এক প্রান্তিক পরিবারের সন্তানের বিশ্বমানের বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার এই সফর বিশ্বজুড়ে হাজারো প্রান্তিক মুসলিম তরুণ-তরুণী ও অনুন্নত জনগোষ্ঠীর শিক্ষার জন্য এক মহা অনুপ্রেরণা।
মতামত