পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্ক যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক এই জোটে যোগ দিতে সক্রিয় আলোচনা চালাচ্ছে। ন্যাটোর অনুকরণে ‘সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা’ নীতিতে গঠিত এই জোট বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা সমীকরণে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।
ব্লুমবার্গের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্বাক্ষরিত কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে তুরস্ক যোগ দেওয়ার বিষয়ে অগ্রসর আলোচনা চলছে। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, আঙ্কারা এই জোটে অন্তর্ভুক্ত হলে এটি কার্যত একটি ‘ন্যাটো ধাঁচের’ প্রতিরক্ষা ব্লকে রূপ নিতে পারে।
মূল চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারায় বলা হয়েছে—জোটভুক্ত কোনো দেশের ওপর আক্রমণ হলে তা সব সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ধারা ন্যাটোর অনুচ্ছেদ-৫ এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ, যা সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ভিত্তি হিসেবে পরিচিত।
তুরস্কের অন্তর্ভুক্তির সম্ভাবনাকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি হিসেবে তুরস্কের রয়েছে শক্তিশালী স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনী, আধুনিক প্রতিরক্ষা শিল্প এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান। অন্যদিকে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতা—খোলা সূত্র অনুযায়ী প্রায় ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেড—এই সম্ভাব্য জোটে একটি শক্তিশালী প্রতিরোধমূলক উপাদান যোগ করতে পারে।
সৌদি আরবের আর্থিক সক্ষমতা, তেলসম্পদ এবং দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সহযোগিতা এই জোটকে আরও কার্যকর করতে পারে। অতীতে হাজারো পাকিস্তানি সেনা সৌদি আরবে মোতায়েন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন, যা দুই দেশের সামরিক সম্পর্কের গভীরতা নির্দেশ করে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের রিয়াদ সফরের সময় সৌদি–পাকিস্তান কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে বাড়তে থাকা অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে একটি বিকল্প কাঠামো তৈরির উদ্যোগ।
তুরস্কের আগ্রহের পেছনে রয়েছে আঙ্কারা–রিয়াদ সম্পর্কের সাম্প্রতিক উষ্ণতা। ২০২২ সালের সমঝোতার পর দুই দেশ ড্রোন উৎপাদনসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা প্রকল্পে সহযোগিতা বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সহ-উৎপাদনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ত্রিপক্ষীয় জোট গঠিত হলে তুরস্কের ন্যাটো অভিজ্ঞতা, সৌদি আরবের অর্থনৈতিক শক্তি এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতার সমন্বয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ভারসাম্য তৈরি হতে পারে। এটি পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তা কাঠামোর বাইরে মধ্যম শক্তিগুলোর স্বতন্ত্র অবস্থান জোরদার করার ইঙ্গিতও দেবে।
আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই উদ্যোগ ইরানের জন্য একটি পাল্টা ভারসাম্য হিসেবে দেখা দিতে পারে, আর ভারত—যার নিজস্ব পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশে নতুন সমীকরণ লক্ষ্য করতে পারে। ইয়েমেন ও সিরিয়ার চলমান সংঘাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্রগুলো জানায়, তুরস্কের ন্যাটো সদস্যপদ ও কূটনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে আলোচনা আপাতত গোপন রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট রাজধানীগুলো থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি অনিশ্চিতই থাকবে।
বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ব্যবস্থায় পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় এই সম্ভাব্য পুনর্বিন্যাস মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
মতামত