ভারতের হরিয়ানা রাজ্যের পালওয়াল জেলায় পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকে ইতিকাফে থাকা মুসল্লিদের লক্ষ্য করে একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। গভীর রাতে সংঘটিত এই হামলায় জানমালের বড় ধরনের ক্ষতি না হলেও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। পুলিশ এই ঘটনায় মামলা দায়ের করলেও মূল অভিযুক্তদের এখনো গ্রেপ্তার করতে না পারায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপটে স্থানীয় কিছু উগ্রবাদী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে অতীতেও ওই মসজিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তোলা হয়েছিল। বিশেষ করে ২০২৫ সালে তথাকথিত ‘ধর্মান্তরকরণ’-এর অভিযোগ তুলে মসজিদের কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালানো হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এই অগ্নিসংযোগকে ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পালওয়ালের পুলিশ সুপার বরুণ সিংলা জানিয়েছেন, "ইমাম জুবায়েরের অভিযোগের ভিত্তিতে রামরূপসহ বেশ কয়েকজন নামীয় ও অনামী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে।" পুলিশের মুখপাত্র সঞ্জয় কুমার বলেন, "সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। যারা পরিবেশ উত্তপ্ত করার চেষ্টা করছে, তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।" তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া না গেলেও অতীতে তাদের পক্ষ থেকে মসজিদের উপস্থিতিকে স্থানীয় ডেমোগ্রাফির জন্য 'হুমকি' হিসেবে প্রচার করার নজির রয়েছে।
গত ১১ মার্চ দিবাগত রাত আনুমানিক ১টা ২৫ মিনিটে পালওয়াল জেলার সদর থানার অন্তর্গত তিকরি ব্রাহ্মণ গ্রামের জামে মসজিদে এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। পবিত্র রমজানের শেষ দশকে মসজিদে তখন ইমাম জুবায়ের, ইকবাল, হানিফ এবং সোহেল ইতিকাফ পালন করছিলেন।
ইমাম জুবায়ের জানান, তারা যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন হঠাৎ তীব্র ধোঁয়া ও উত্তাপে তাদের ঘুম ভেঙে যায়। অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা মসজিদের জানলা ভেঙে ভেতরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। মুসল্লিদের চিৎকারে গ্রামবাসী দ্রুত ছুটে এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন, ফলে বড় ধরনের হতাহতের ঘটনা থেকে তারা রক্ষা পান।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, এই গ্রামে মুসলিমরা সংখ্যালঘু। গত বছরও মিথ্যা অভিযোগে এখানকার অনেক মুসলিমকে বিনা বিচারে কারাগারে যেতে হয়েছিল। এক বাসিন্দা আক্ষেপ করে বলেন, "পবিত্র মাসেও আমরা নিরাপদ নই। এভাবে বারবার আমাদের ওপর আক্রমণ দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। কতদিন মানুষ নিরব থাকবে?" বর্তমানে গ্রামে ৫-৬টি পুলিশ টিম মোতায়েন করা হয়েছে এবং থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের নিজ ধর্ম পালন ও উপাসনালয়ের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তিকরি ব্রাহ্মণ গ্রামের এই ঘটনা কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত।
পূর্ববর্তী বছরগুলোতে এই এলাকায় ধর্মীয় মেরুকরণ এবং প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার যে অভিযোগ রয়েছে, তা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উৎসাহিত করছে। নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, কেবল মামলা দায়ের করলেই ইনসাফ কায়েম হয় না; বরং ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। উপাসনালয়ে হামলার ঘটনাগুলো নাগরিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে। পবিত্র রমজান মাসে এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলা বিশ্বজুড়ে উম্মাহর হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব।
মতামত