তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত দুই দশকে দুই মুসলিম দেশের বাণিজ্য ৫৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রণালি সংকটের পটভূমিতে এই বাণিজ্যকে ৫ বিলিয়ন ডলারে রূপান্তর এবং বিকল্প বাণিজ্য করিডোর গঠনের যৌথ ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত।
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আঙ্কারায় কাতারের বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আহমেদ বিন মোহাম্মদ আল-সায়েদের সাথে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই খতিয়ান তুলে ধরেন।
মন্ত্রী ওমর বোলাত জানান, গত ২১ বছরে আঙ্কারা ও দোহার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৫৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের লক্ষ্য এখন এই বাণিজ্যকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল। নতুনভাবে কার্যকর হওয়া 'বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি' (TEPA)-র মাধ্যমে এই ধারাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কাতারের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তুর্কি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তুর্কি ঠিকাদাররা কাতারে এ পর্যন্ত ২০৬টি বৃহৎ প্রকল্পে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করেছে। একই সাথে উৎপাদন, সেবা ও নির্মাণ খাত মিলিয়ে প্রায় ১,১১৬টি তুর্কি কোম্পানি কাতারে সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে, কাতার তুরস্কে তাদের বিনিয়োগের পরিধি ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছে। দেশটির প্রায় ২৫০টি কাতারি কোম্পানি তুরস্কে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা মূলত ব্যাংকিং ও অর্থায়ন, টেকসই জ্বালানি, আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস, গণমাধ্যম এবং কৃষি খাতে বিস্তৃত। কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (QIA) তুরস্কে তাদের বিনিয়োগের বহর আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
হরমুজ সংকট ও বিকল্প আঞ্চলিক বাণিজ্য পথ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেন কোনো ধরনের খাদ্য বা পণ্য সংকট তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে বিকল্প স্থল ও ট্রানজিট পথ তৈরিতে জোর দিয়েছে দুই দেশ।
তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, কাতারসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভোক্তা পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে কাজ করছে তুরস্ক। বর্তমানে সৌদি আরবের সাথে সম্পাদিত ট্রানজিট পরিবহন চুক্তির আওতায় তুর্কি পণ্যবাহী যানবাহন সিরিয়া, জর্ডান এবং সৌদি আরব অতিক্রম করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পৌঁছাচ্ছে। পাশাপাশি ইরাক ও সৌদি ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিকল্প করিডোর সচল রাখা হয়েছে। তুরস্ক ও কাতার ভবিষ্যতে এসব বিকল্প বাণিজ্যিক পথকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করার উদ্যোগ নেবে।
মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সংহতির স্বার্থে তুরস্ক ও কাতারের এই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ও বাণিজ্য জোট একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত দুই দশকে দুই মুসলিম দেশের বাণিজ্য ৫৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও প্রণালি সংকটের পটভূমিতে এই বাণিজ্যকে ৫ বিলিয়ন ডলারে রূপান্তর এবং বিকল্প বাণিজ্য করিডোর গঠনের যৌথ ঘোষণা দিয়েছেন তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত।
তুরস্ক ও কাতারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অঙ্গনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আঙ্কারায় কাতারের বৈদেশিক বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আহমেদ বিন মোহাম্মদ আল-সায়েদের সাথে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী ওমর বোলাত দুই দেশের যৌথ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই খতিয়ান তুলে ধরেন।
মন্ত্রী ওমর বোলাত জানান, গত ২১ বছরে আঙ্কারা ও দোহার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ৫৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের লক্ষ্য এখন এই বাণিজ্যকে ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা। ২০২২ সালে কাতারে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে অবকাঠামোগত উন্নয়নের সময়ে দুই দেশের বাণিজ্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উন্নীত হয়েছিল। নতুনভাবে কার্যকর হওয়া 'বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি' (TEPA)-র মাধ্যমে এই ধারাকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হচ্ছে।
কাতারের অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে তুর্কি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তুর্কি ঠিকাদাররা কাতারে এ পর্যন্ত ২০৬টি বৃহৎ প্রকল্পে প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত কাজ সম্পন্ন করেছে। একই সাথে উৎপাদন, সেবা ও নির্মাণ খাত মিলিয়ে প্রায় ১,১১৬টি তুর্কি কোম্পানি কাতারে সক্রিয় রয়েছে।
অন্যদিকে, কাতার তুরস্কে তাদের বিনিয়োগের পরিধি ক্রমাগত সম্প্রসারিত করছে। দেশটির প্রায় ২৫০টি কাতারি কোম্পানি তুরস্কে ৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা মূলত ব্যাংকিং ও অর্থায়ন, টেকসই জ্বালানি, আন্তর্জাতিক লজিস্টিকস, গণমাধ্যম এবং কৃষি খাতে বিস্তৃত। কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (QIA) তুরস্কে তাদের বিনিয়োগের বহর আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
হরমুজ সংকট ও বিকল্প আঞ্চলিক বাণিজ্য পথ মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক সংঘাতের কারণে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক পণ্য পরিবহন প্রতিনিয়ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যেন কোনো ধরনের খাদ্য বা পণ্য সংকট তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যে বিকল্প স্থল ও ট্রানজিট পথ তৈরিতে জোর দিয়েছে দুই দেশ।
তুরস্কের বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, কাতারসহ পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের ভোক্তা পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে কাজ করছে তুরস্ক। বর্তমানে সৌদি আরবের সাথে সম্পাদিত ট্রানজিট পরিবহন চুক্তির আওতায় তুর্কি পণ্যবাহী যানবাহন সিরিয়া, জর্ডান এবং সৌদি আরব অতিক্রম করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে পৌঁছাচ্ছে। পাশাপাশি ইরাক ও সৌদি ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিকল্প করিডোর সচল রাখা হয়েছে। তুরস্ক ও কাতার ভবিষ্যতে এসব বিকল্প বাণিজ্যিক পথকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করার উদ্যোগ নেবে।
মুসলিম বিশ্বের সামগ্রিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সংহতির স্বার্থে তুরস্ক ও কাতারের এই দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত ও বাণিজ্য জোট একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন