জনগণের ভোটে প্রাপ্ত গণভোটের রায়কে উপেক্ষা করার কোনো রাজনৈতিক বা আইনি সুযোগ নেই উল্লেখ করে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির আল্লামা মামুনুল হক সতর্ক করেছেন, এই গণরায় বাস্তবায়ন করা সরকারের বৈধতার স্বার্থেই অপরিহার্য। শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) বগুড়ার সাতমাথার খোকন পার্কে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বগুড়া জেলা শাখা আয়োজিত বিশাল এক নাগরিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আল্লামা মামুনুল হক বলেন, একই নির্বাচন কমিশন ও একই তফসিলে অনুষ্ঠিত গণভোটের ফলাফল অমান্য করা জনগণের সঙ্গে চরম প্রতারণা।
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বগুড়ায় আয়োজিত নাগরিক সমাবেশে সরকারের নীতি ও সংবিধান সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে কড়া হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির শায়খুল হাদিস আল্লামা মামুনুল হক।
বগুড়া জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা মামুন রাহমানীর সভাপতিত্ব অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আল্লামা মামুনুল হক বলেন, "একই নির্বাচন কমিশন, একই তফসিল এবং একই দিনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে দুই নির্বাচনের ফলাফলও ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে একটি নির্বাচনের ফলাফলকে বৈধ দাবি করে অন্য গণভোটের রায়কে অবৈধ বা উপেক্ষিত রাখার কোনো সুযোগ নেই।"
তিনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ঐতিহাসিক রূপরেখার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "দীর্ঘ আলোচনা ও সর্বসম্মত ঐকমত্যের মধ্য দিয়েই ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল এবং তা বাস্তবায়নের জন্যই গণভোটের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারিত হয়। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর সেই গণভোটের রায়কে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার যে অবস্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা সরাসরি দেশবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতির খেলাফ এবং জনগণের সাথে চরম প্রতারণা।"
সরকারকে নমনীয় ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, "এখনো সময় আছে। সরকারের উচিত বিষয়টি নিয়ে গভীর চিন্তা করা এবং জনগণের অর্পিত আমানত ও প্রত্যাশার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। কারণ, জনগণের সামনে দেওয়া কোনো প্রতিশ্রুতি কোনো শাসকই দীর্ঘমেয়াদে এড়িয়ে যেতে পারে না।"
সংবিধানের সাময়িক সংশোধন ও স্থায়ী সংস্কারের মৌলিক পার্থক্য ব্যাখ্যা করে কওমি আলেম সমাজের এই শীর্ষ নেতা বলেন, "সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন যদি কেবল সাধারণ সংশোধনের মাধ্যমে করা হয়, তবে পরবর্তী কোনো সরকার এসে তা পুনরায় বাতিল বা পরিবর্তন করে দিতে পারে। তাই আমাদের এমন স্থায়ী ও কার্যকর সংস্কার ব্যবস্থার দিকে যেতে হবে, যেন ভবিষ্যতের কোনো শাসক নিজের সুবিধা অনুযায়ী জনগণের অর্জনকে নস্যাৎ করতে না পারে।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, "আমরা দুর্বল বা সাময়িক কোনো সংশোধন চাই না; আমরা এমন টেকসই সংস্কার চাই, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করবে।"
সমাবেশে নতুন বাংলাদেশে ইসলামী নেতৃত্বের রূপরেখা তুলে ধরে আল্লামা মামুনুল হক উল্লেখ করেন, বৈষম্যবিরোধী ও গণআন্দোলনে আলেম-ওলামা ও শাপলা চত্বরের বীরদের আত্মত্যাগ ও ভূমিকা সর্বজনবিদিত। বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলেম-ওলামাদের সুদৃঢ় ও দূরদর্শী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার এক ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একইসঙ্গে ইসলামপন্থীদের ঐক্যবিনাশী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা জারি করে খেলাফত মজলিস প্রধান বলেন, "বর্তমানে ইসলামপন্থী শক্তির মধ্যে পারস্পরিক বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টির জন্য গভীর চক্রান্ত চলছে। এক পক্ষকে আরেক পক্ষের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে ইসলামপন্থীদের উদীয়মান রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করাই এই ষড়যন্ত্রের মূল উদ্দেশ্য। দেশের ইসলামী দল ও নেতৃত্বকে অত্যন্ত দূরদর্শিতার সঙ্গে এই চক্রান্ত নস্যাৎ করতে হবে।"
উক্ত নাগরিক সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য প্রদান করেন— বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আবুল হাসানাত জালালী, সিরাজগঞ্জ জেলা সভাপতি মাওলানা আব্দুর রউফ, বাংলাদেশ খেলাফত যুব মজলিসের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মোশাররফ হুসাইন লাবীব এবং বাংলাদেশ খেলাফত ছাত্র মজলিসের কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক মুহাম্মাদ আব্দুল আহাদ। এছাড়াও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন উলামায়ে কেরাম, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং বগুড়ার সর্বস্তরের তাওহিদি জনতা সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন।
মতামত