ভারতের তেলেঙ্গানা রাজ্যের হায়দ্রাবাদে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে চরম অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে অভিযুক্ত উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা ও বিধায়ক টি রাজা সিংকে খালাস দিয়েছেন স্থানীয় এমপি/এমএলএ সংক্রান্ত বিশেষ আদালত। চার বছর ধরে চলা এই চাঞ্চল্যকর মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারক পুলিশ ও তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মারাত্মক ব্যর্থতা এবং তথ্যগত ত্রুটিকে খালাসের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এতে একদিকে ভারতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ভারতের সাধারণ মুসলিম সম্প্রদায়।
মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক মন্তব্য
২০২২ সালের ২২ আগস্ট রাতে সাবেক বিজেপি বিধায়ক রাজা সিং তার ইউটিউব চ্যানেল ‘শ্রী রাম চ্যানেল তেলেঙ্গানা’-য় “ফারুকি কে আকাক কা ইতিহাস শুনিয়ে” শীর্ষক একটি ১০ মিনিটের দীর্ঘ ভিডিও আপলোড করেন। ওই ভিডিওতে তিনি মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র বৈবাহিক জীবন ও পারিবারিক ইতিহাস নিয়ে সরাসরি বিভ্রান্তিকর ও কুৎসিত মন্তব্য করেন।
এখানেই ক্ষান্ত না হয়ে, তিনি পবিত্র কুরআনুল কারীমকে ব্যঙ্গ করে ‘সবুজ বই’ (হারা কিতাব) বলে অভিহিত করেন। ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশ্যে কুৎসিত ইঙ্গিত করে ‘গোল টুপিওয়ালা’ বলে আখ্যায়িত করেন এবং মুসলিমরা গোহত্যার সঙ্গে জড়িত বলে উস্কানিমূলক অভিযোগ তোলেন।
বিক্ষোভ ও গ্রেপ্তার
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই হায়দ্রাবাদের ওল্ড সিটিসহ বিভিন্ন স্থানে মুসলিম জনতা রাজপথে নেমে এসে তীব্র প্রতিবাদ জানান।
ব্যাপক আন্দোলনের মুখে বিজেপি দল থেকে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে। তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধির (আইপিসি) ১৫৩(এ) (বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি), ২৯৫(এ) (ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত), ৫০৪, ৫০৫ এবং ৫০৬ ধারায় তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়।
আদালতের অদ্ভুত পর্যবেক্ষণ ও তদন্তের ত্রুটি
সম্প্রতি প্রকাশিত আদালতের বিস্তারিত রায়ে দেখা যায়, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা ও পক্ষপাতমূলক ভূমিকার সুযোগ নিয়ে আসামি খালাস পেয়েছেন।
ধর্মীয় তথ্যের অসম্পূর্ণ ব্যাখ্যা: আদালত তার পর্যবেক্ষণে জানায়, মহানবী (সা.)-এর বিবাহ সম্পর্কিত যে বক্তব্য রাজা সিং দিয়েছেন তা নাকি ইসলামিক ইতিহাস ও হাদিসের বিবরণের সাথে মেলে। ফলে আসামির কোনো ‘বিদ্বেষমূলক উদ্দেশ্য’ ছিল না বলে আদালত ধরে নেয়।
‘হারা কিতাব’ ও ‘গোল টুপি’ প্রসঙ্গ: আদালত বিতর্কিত মন্তব্যগুলোকে লঘুকরণ করে দাবি করে, সবুজ রঙের বই সমাজে নিত্যদিনের সাধারণ দৃশ্য, তাই এটিকে সরাসরি কুরআন অবমাননা হিসেবে প্রমাণের সুযোগ নেই।
প্রমাণের অভাব ও ফরেনসিক গাফিলতি: সবচেয়ে মারাত্মক বিষয়টি হলো, তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) চার্জশিট দাখিলের আগে বিতর্কিত বক্তব্যটির সত্যতা কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় উৎস থেকে যাচাইই করেননি। এছাড়া প্রসিকিউশনের নিজস্ব ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ভিডিও প্রমাণের মধ্যে ফাঁক ও অসামঞ্জস্যতা চিহ্নিত করেছেন।
ডিজিটাল প্রমাণের অনুপস্থিতি: যে মোবাইল ফোনটি দিয়ে মূল ভিডিওটি দেখা ও আপলোড করা হয়েছিল, পুলিশ তা কখনো জব্দই করেনি।
ন্যায়বিচারে চরম ব্যর্থতা
মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী নেতাদের উস্কানিমূলক ঘৃণাসূচক বক্তব্যের (Hate Speech) বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনায় পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এই ধরণের গাফিলতি মূলত আসামিদের পার পাইয়ে দেওয়ার এক ধরণের পরোক্ষ চক্রান্ত। আদালতের এই রায় ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের আইনগত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে এক গভীর আস্থাহীনতার সৃষ্টি করেছে।
মতামত