পাকিস্তানের সংবিধানে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের প্রায় আট মাস পর পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের (আজাদ জম্মু ও কাশ্মীর) আইনপ্রণেতারা নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের জন্য ভোটাভুটিতে অংশ নিয়েছেন।
পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরে অবশেষে পূরণ হতে চলেছে দীর্ঘদিনের শূন্য থাকা সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ—রাষ্ট্রপতি।
তবে এই নির্বাচন কেবল একটি সাধারণ ভোটগ্রহণ নয়; এটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন অঞ্চলটিতে মারাত্মক সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে।
আজাদ কাশ্মীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের গাণিতিক ও রাজনৈতিক চিত্র:
- আইনসভার মোট আসন সংখ্যা : ৫৩
- নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে পূর্ণ হওয়া আসন : ৪৬
- বিক্ষোভ ও সহিংসতার কারণে স্থগিত/শূন্য আসন : ০৭
- রাষ্ট্রপতি পদে জয়ের জন্য প্রয়োজনীয় একক ভোট : ২৭
- পিএমএল-এন (PML-N) জোটের আসন সংখ্যা : ৩২
- পাকিস্তান পিপলস পার্টি (PPP)-র আসন সংখ্যা : ১৪
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কারা?
শাসক জোট পিএমএল-এন-এর পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৬২ বছর বয়সী নাজিব নাকি খান, যিনি সুধনোটি জেলার পালান্দ্রির কয়েকবারের সাবেক বিধানসভা সদস্য এবং সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের দায়িত্ব সামলেছেন।
রাজ্য সংবিধান অনুযায়ী, বিজয়ী হওয়ার জন্য আসন সংখ্যা যা-ই থাকুক না কেন, প্রার্থীকে ন্যূনতম ২৭টি ভোট পেতে হয়।
৮ মাস কেন খালি ছিল রাষ্ট্রপতির পদ?
২০২১ সালে কারাবন্দী নেতা ইমরান খানের দল পিটিআই-এর টিকেটে নির্বাচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি সুলতান মেহমুদ চৌধুরী গত ৩১শে জানুয়ারি ৭১ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
আইন অনুযায়ী, পদ শূন্য হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। তবে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের কারণে ভোট বারবার পিছিয়ে দেওয়া হয়। কাশ্মীরের রাজনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক ও বই ‘পুঞ্চ: পরিচয়, রাজনীতি ও প্রতিরোধ’-এর লেখক এরশাদ মাহমুদ বলেন, 'কেন্দ্রীয় সরকারের কৌশলী অবস্থানের কারণেই সাংবিধানিক বিধান লঙ্ঘন করে নির্বাচন বিলম্বিত করা হয়েছে। তারা চেয়েছে আজাদ কাশ্মীরে নিজেদের পছন্দসই সরকার গঠন নিশ্চিত করে এরপর নিজেদের লোক রাষ্ট্রপতির আসনে বসাতে—এবং বাস্তবত তা-ই ঘটেছে।'
কেন স্থগিত পুঞ্চের ৭ আসন?
আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরের নির্বাচন তিন ধাপে (২৭শে জুলাই, ২রা আগস্ট এবং ১০ই আগস্ট) সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও, নাগরিক আন্দোলনের চরম উত্তেজনার মুখে পুঞ্চ বিভাগের পুঞ্চ জেলার ৫টি এবং সুধনতির ২টি আসনে ভোট স্থগিত রাখা হয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি (অব.) গোলাম মুস্তফা মুঘল স্পষ্ট করেছেন যে, আইনগতভাবে অসম্পূর্ণ বিধানসভা হলেও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো সাংবিধানিক বাধা নেই। তবে বিশ্লেষক এরশাদ মাহমুদ একে পুঞ্চের জনগণের প্রতি এক ধরনের ‘সম্মিলিত শাস্তি’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, অধিকার ও সংস্কার চাওয়া এলাকাগুলোকে প্রতিনিধি নির্বাচন থেকে বঞ্চিত করে ক্ষমতাসীনেরা এক ভীতিকর বার্তা দিচ্ছে।
ব্যাকগ্রাউন্ড: গণঅসন্তোষ ও নিহত ৫০
পাহাড়ি অঞ্চলটিতে মূল ক্ষোভ জম্মু কাশ্মীর জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটির (জেএসি) ওপর সরকারের দমন-পীড়নকে ঘিরে, যা গত ৫ জুন সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় নিষিদ্ধ করা হয়।
নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই টানা অস্থিরতা ও সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৫০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে পুরো অঞ্চলে টানা ৯৯ দিন ইন্টারনেট বন্ধ রাখা হয়েছিল, যা গত ১৩ই সেপ্টেম্বর আংশিকভাবে চালু করা হয়।
সাংবিধানিক প্রক্রিয়া কাগজ-কলমে সম্পন্ন হলেও, রক্তক্ষয়ী সংঘাত আর জনগণের ভোটাধিকার বঞ্চিত রেখে গঠিত এই সরকার ও নতুন রাষ্ট্রপতি অঞ্চলের গণঅসন্তোষ কতটা প্রশমিত করতে পারবেন—সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
মতামত