জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া প্রথম ভাষণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনসহ দেশি-বিদেশি সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক নির্বাচনের পর এটিই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম দৃষ্টিভঙ্গির রূপরেখা। ১৭ মিনিটের এই সাবলীল বাংলা ভাষণে ফিলিস্তিনের স্থায়ী সমাধান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের 'থ্রি-আর' কৌশল এবং আন্তর্জাতিক শান্তির বার্তা তুলে ধরা হয়।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন সম্ভাবনা ও দৃঢ় অবস্থানের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। সামরিক সংঘাতের বদলে কূটনৈতিক সমাধান, ফিলিস্তিনের সার্বভৌমত্ব এবং দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও অর্থনৈতিক সংস্কারের বার্তা দিয়ে সর্বস্তরের মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে 'থ্রি-আর' কৌশল ও সার্বভৌম উন্নয়ন
জাতীয় অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে সরকারের বিশেষ পথরেখা 'থ্রি-আর'—রিকভারি (পুনরুদ্ধার), রেস্টোরেশন (পুনঃস্থাপন) ও রিকনস্ট্রাকশন (পুনর্গঠন) কৌশল উপস্থাপন করেন। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ এ বিষয়ে বলেন, দেড় দশকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণে দেশের অর্থনৈতিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছিল। এই সংকটকালে প্রধানমন্ত্রীর 'থ্রি-আর' কৌশল অত্যন্ত সময়োপযোগী।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রধানমন্ত্রী বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতার চেয়ে দেশের নিজস্ব দায়বদ্ধতা ও 'বাংলাদেশ ফার্স্ট' নীতির ওপর জোর দিয়েছেন। ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং অভ্যন্তরীণ কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর প্রতি সরকারের এই গুরুত্ব বিদেশি ঋণের ঝুঁকি থেকে দেশকে রক্ষা করবে।
রোহিঙ্গা সংকট ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা
ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বেপারী বলেন, 'রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশ তৈরি করেনি, তাই প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারকেই মূল ভূমিকা পালন করতে হবে।' চীনা, মার্কিন ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী এই ইস্যুতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও স্থায়ী সমাধান দাবি করেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান উল্লেখ করেন, জাতিসংঘে এবারই প্রথম রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ এত স্পষ্ট ও শক্তিশালী অবস্থান প্রকাশ করেছে।
ফিলিস্তিনের প্রতি অবিচল সমর্থন ও বৈশ্বিক শান্তি
'প্রতিদিনের বাংলাদেশ' সম্পাদক মারুফ কামাল খান জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে স্পষ্টভাবে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌমিক ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশের জাতীয় নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, ফিলিস্তিন সংকটের স্থায়ী সমাধান ছাড়া মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বে স্থায়ী শান্তি আনা সম্ভব নয়। 'ঘাতক অস্ত্র নয়, পৃথিবী বদলাবে মানবতায়'—প্রধানমন্ত্রীর এই ঐতিহাসিক উক্তি বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার ও কূটনৈতিক দর্শনের স্মারক।
জলবায়ু ও গণতান্ত্রিক সংস্কার
ভাষণে জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের পক্ষে সোচ্চার হওয়ার পাশাপাশি নারীর শিক্ষা, শিশ সুরক্ষার গুরুত্ব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর আলোকপাত করা হয়। সামরিক ব্যয়ের লাগাম টেনে সেই অর্থ উন্নয়নমূলক খাতে বরাদ্দের জোরালো আহ্বান জানান তিনি।
প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ বলেন, ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়ার পর জিয়া পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে তারেক রহমান জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিলেন, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস ও বৈশ্বিক মর্যাদার অনন্য দলিল। ঢাবির শিক্ষার্থী তামজিদ এবং সাধারণ নাগরিক শাহীন ও জসীম জানান, বিশ্বমঞ্চে এই ভাষণ তাদের আত্মমর্যাদা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে।
মতামত