ভারতের আসামে চলন্ত ট্রেনের ভেতর এক মুসলিম নারীকে প্রকাশ্য দিবালোকে হেনস্তা, ব্যাগ তল্লাশি এবং 'বাংলাদেশি' বলে গালিগালাজ করার একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী নারীর ভাই বিএসএফ (BSF) সদস্য এবং বাবা পুলিশে কর্মরত থাকা সত্ত্বেও কেবল ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাকে এই চরম অপমানের শিকার হতে হয়েছে। এই ঘটনায় এআইএমআইএম (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসিসহ রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মীরা তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইনি পদক্ষেপের দাবি তুলেছেন।
গত ১৬ মে আসামের শিলচর থেকে গুয়াহাটিগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে এই ন্যক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। ভুক্তভোগী নারী, যাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে 'শামশাদ' নামে শনাক্ত করা হয়েছে, তিনি মাথায় স্কার্ফ (হিজাব) এবং কুর্তা পরিহিত অবস্থায় নাগাল্যান্ডের ডিমাপুরের দিকে যাচ্ছিলেন। যাত্রাপথে সহযাত্রীদের একটি দল হঠাৎ করেই তাকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে জেরা করতে শুরু করে এবং তার অনুমতি ছাড়াই ব্যাগপত্র ও জিনিসপত্র তল্লাশি করে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া এবং ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করা ওই ভিডিওতে দেখা যায়, হেনস্থার শিকার ওই নারী অত্যন্ত আতঙ্কিত ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে সাধারণ কিছু যাত্রী মিলে তাকে প্রকাশ্য জনসম্মুখে 'বাংলাদেশি' বলে মৌখিকভাবে চরম গালিগালাজ ও মানসিক নির্যাতন চালায়।
কে এই হেনস্তাকারী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন?
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই উন্মত্ত দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মধুস্মিতা রায় (ফেসবুক নাম: মধুস্মিতা রায় মৌ) নামের এক নারী। নিজেকে তিনি শিলচরের রাঙ্গিরখাড়ি পুলিশ ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (OC) স্ত্রী বলে দাবি করেন। তল্লাশির পর ওই নারীর ব্যাগ থেকে কোনো সন্দেহজনক বা অবৈধ কিছু না পাওয়া গেলেও, মধুস্মিতা ও তার দল ভুক্তভোগীর নাগরিকত্বের কাগজপত্র স্ক্রুটিনি বা পরীক্ষা করার নামে দীর্ঘক্ষণ ধরে তাকে হেনস্তা ও অপমান করতে থাকে।
ভুক্তভোগীর পারিবারিক পরিচয়
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম 'বারাক বুলেটিন'-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হেনস্থার শিকার ওই নারী কাছাড় জেলার বদরিপারের বাসিন্দা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, তার বাবা খোদ আসাম পুলিশ বিভাগে কর্মরত এবং তার ভাই ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বা বিএসএফ (BSF)-এ দেশের সুরক্ষায় নিয়োজিত রয়েছেন।
মানবাধিকার কর্মী ও সমালোচকদের তীব্র ক্ষোভ
এই ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকে ভারতে 'মোরাল পুলিশিং' বা নৈতিকতার নামে অনধিকার চর্চা এবং জাতিগত-ধর্মীয় বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মীরা প্রশ্ন তুলেছেন, সাধারণ কিছু যাত্রী কোন আইনের বলে চলন্ত ট্রেনের ভেতর একজন সহযাত্রীকে এভাবে জেরা ও তল্লাশি করার দুঃসাহস পায়? নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে যেখানে রেলওয়ে সুরক্ষা বাহিনী (RPF) বা রেল পুলিশকে জানানোর নিয়ম, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার করে একজন নারীকে জনসমক্ষে এভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
আসামে নাগরিকত্ব (NRC) এবং অনুপ্রবেশ ইস্যুকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরেই সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে এক ধরনের উত্তেজনা বিরাজ করছে। এর আগেও বিভিন্ন সময় সাধারণ নাগরিকদের ‘বিদেশি’ বা ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হেনস্তা করার বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটেছে। তবে চলন্ত ট্রেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভ করে এভাবে হেনস্তা করার ঘটনা আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির নতুন এক সংকটের দিক উন্মোচন করেছে।
একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রে ট্রেনের মতো গণপরিবহনে একজন সাধারণ নাগরিকের এমন হেনস্তা কোনোভাবেই কাম্য নয়। আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সাধারণ মানুষের এই বিচারিক মানসিকতা রুখতে এবং ট্রেনে যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের অনতিবিলম্বে কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
মতামত