বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর মালয়েশিয়ার প্রস্তাব মেনে নিল মিয়ানমার; এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও আরও তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফেরানোর বার্তা দিল নেপিডো

মালয়েশিয়ায় থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফেরত নিতে সম্মত মিয়ানমার: প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম



মালয়েশিয়ায় থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফেরত নিতে সম্মত মিয়ানমার: প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৫ হাজার আরাকানীয় (রোহিঙ্গা) মুসলিমকে নিজ দেশে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। ৩০ জুলাই আনকারায় এক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বরাতে প্রকাশিত খবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এই ঘোষণা নিশ্চিত করেন। দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার প্রথম ধাপে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনে রাজি হলো। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও আনুমানিক তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সংকেত দিয়েছে নেপিডো।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ৫ হাজার আরাকানীয় (রোহিঙ্গা) মুসলিমকে মিয়ানমার নিজ দেশে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

মালয়েশিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মালে মেইল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন (নেপিডো) ইতিপূর্বে কোনোভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার বা গ্রহণ করতে চায়নি। তবে মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে গড়ে ওঠা "দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক ও গঠনমূলক আলোচনার" কারণে এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, প্রাথমিক ধাপে মিয়ানমার তাদের দেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া অন্তত ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন করবে।

অন্যদিকে, ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে-র বরাতে আনোয়ার ইব্রাহিম আরও উল্লেখ করেন যে, নেপিডো প্রশাসন শুধু মালয়েশিয়া নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফিরিয়ে নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে আশ্রিত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কবে এবং কীভাবে শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।

আরাকানে মুসলিম নিধন

মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসলেও, রাষ্ট্রীয় মদদে তাদের ওপর চরম নিপীড়ন চালানো হয়েছে। ২০১২ সালে উগ্র বৌদ্ধ চরমপন্থী ও সৈন্যদের যৌথ হামলায় হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম নির্মমভাবে শহীদ হন এবং বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয়।

পরবর্তীকালে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকানের সীমান্ত চৌকিতে হামলার অজুহাত তুলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও পদ্ধতিগত গণহত্যা শুরু করে। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে জীবন বাঁচাতে ও সপরিবারে বেঁচে থাকার আকুতিতে ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, আরাকানের শত শত মুসলিম গ্রাম জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ঘটে যাওয়া এই বীভৎস সহিংসতাকে "জাতিগত নিধন" (Ethnic Cleansing) এবং "গণহত্যা" (Genocide) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের শমন ও বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শেষপর্যন্ত মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

বিষয় : রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬


মালয়েশিয়ায় থাকা ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফেরত নিতে সম্মত মিয়ানমার: প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম

প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬

featured Image

মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৫ হাজার আরাকানীয় (রোহিঙ্গা) মুসলিমকে নিজ দেশে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। ৩০ জুলাই আনকারায় এক আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থার বরাতে প্রকাশিত খবরে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এই ঘোষণা নিশ্চিত করেন। দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক কূটনৈতিক যোগাযোগের ধারাবাহিকতায় মিয়ানমার প্রথম ধাপে এই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে প্রত্যাবাসনে রাজি হলো। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকেও আনুমানিক তিন লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সংকেত দিয়েছে নেপিডো।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রায় ৫ হাজার আরাকানীয় (রোহিঙ্গা) মুসলিমকে মিয়ানমার নিজ দেশে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

মালয়েশিয়ার স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মালে মেইল-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্প্রতি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, মিয়ানমারের সামরিক প্রশাসন (নেপিডো) ইতিপূর্বে কোনোভাবেই রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিজেদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার বা গ্রহণ করতে চায়নি। তবে মালয়েশিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে গড়ে ওঠা "দ্বিপাক্ষিক সুসম্পর্ক ও গঠনমূলক আলোচনার" কারণে এই ঐতিহাসিক সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তিনি নিশ্চিত করেন, প্রাথমিক ধাপে মিয়ানমার তাদের দেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নেওয়া অন্তত ৫ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাবাসন করবে।

অন্যদিকে, ফ্রি মালয়েশিয়া টুডে-র বরাতে আনোয়ার ইব্রাহিম আরও উল্লেখ করেন যে, নেপিডো প্রশাসন শুধু মালয়েশিয়া নয়, প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকেও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিমকে ফিরিয়ে নিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তবে বাংলাদেশে আশ্রিত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া কবে এবং কীভাবে শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সূচি এখনো নির্ধারিত হয়নি।

আরাকানে মুসলিম নিধন

মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসলেও, রাষ্ট্রীয় মদদে তাদের ওপর চরম নিপীড়ন চালানো হয়েছে। ২০১২ সালে উগ্র বৌদ্ধ চরমপন্থী ও সৈন্যদের যৌথ হামলায় হাজার হাজার নিরীহ মুসলিম নির্মমভাবে শহীদ হন এবং বহু ঘরবাড়ি পুড়িয়ে ভস্মীভূত করা হয়।

পরবর্তীকালে, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট আরাকানের সীমান্ত চৌকিতে হামলার অজুহাত তুলে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদ ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো মুসলিমদের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ও পদ্ধতিগত গণহত্যা শুরু করে। জাতিসংঘের তথ্যানুসারে, ২০১৭ সালের আগস্টের পর থেকে জীবন বাঁচাতে ও সপরিবারে বেঁচে থাকার আকুতিতে ৯ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, আরাকানের শত শত মুসলিম গ্রাম জ্বালিয়ে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়ের শীর্ষ মানবাধিকার সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর ঘটে যাওয়া এই বীভৎস সহিংসতাকে "জাতিগত নিধন" (Ethnic Cleansing) এবং "গণহত্যা" (Genocide) হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। আন্তর্জাতিক আদালতের শমন ও বিশ্বব্যাপী তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে শেষপর্যন্ত মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের এই প্রাথমিক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হচ্ছে বলে মনে করছেন ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ