ভারতের উত্তরপ্রদেশের সিদ্ধার্থনগর জেলায় দীর্ঘ প্রায় ছয় দশকের পুরোনো একটি মাদ্রাসা ও মসজিদ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার সকালে দুমারিয়াগঞ্জ এলাকার পিপরা রামলাল গ্রামে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের উপস্থিতিতে এ উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়। প্রশাসনের দাবি, খাসজমিতে খেলার মাঠের জন্য নির্ধারিত স্থানে অবৈধভাবে এটি নির্মিত হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের অভিযোগ, বহু পুরোনো এই দ্বীনি ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানটি উচ্ছেদ করে মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার ও শিক্ষার ওপর আঘাত হানা হয়েছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশে মুসলিম ধর্মীয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক নিপীড়ন ও বুলডোজার অভিযানের ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো সিদ্ধার্থনগর জেলার ‘মাদ্রাসা আরাবিয়া জিয়াউল উলুম’। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক দ্বীনি প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘ ৫৯ বছর ধরে ওই অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শত শত মুসলিম শিশুকে শিক্ষা দিয়ে আসছিল। মঙ্গলবার সকালে কোনো প্রকার সামাজিক সংবেদনশীলতা তোয়াক্কা না করেই ছয়টি বুলডোজার নিয়ে একযোগে এই প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালায় প্রশাসন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গ্রামসভার ১০২৮ ও ১০২৯ নম্বর প্লটের জমি সরকারি এবং তা খেলার মাঠের জন্য সংরক্ষিত। সেই জমিতে অনুমোদন ছাড়াই মাদ্রাসা ও মসজিদের একাংশ গড়ে তোলা হয়েছিল। সাব-ডিভিশনাল ম্যাজিস্ট্রেট (এসডিএম) বিবেকানন্দ মিশ্রের নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে মাদ্রাসার সাতটি ঘর, একটি মিলনায়তনের অংশ এবং একটি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। নিরাপত্তার অজুহাতে পাঁচটি থানার শত শত সশস্ত্র পুলিশ দিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসার দায়িত্বশীলরা এ ঘটনাকে চরম অন্যায় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বিগত ছয় দশক ধরে যে প্রতিষ্ঠানটি সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হয়ে আসছে, তা হঠাৎ করেই উচ্ছেদ করার পেছনে প্রশাসনিক বৈষম্য ও উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি কাজ করছে। জমি সংক্রান্ত প্রশাসনিক আইনি লড়াইয়ের কথা বলা হলেও, সেখানে ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হয়েছে।
উচ্ছেদের সময় স্থানীয় মুসলিম জনগণ ও রাজনৈতিক কর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান। দুমারিয়াগঞ্জের সমাজবাদী পার্টির (এসপি) বিধায়ক সৈয়দা খাতুন এবং এসপির জেলা সভাপতি লালজি যাদবের নেতৃত্বে অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী ঘটনাস্থলে পৌঁছে এই বেআইনি পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন। এ সময় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা ও ধাক্কাধাক্কির ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি থমথমে হয়ে উঠলে পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে এলাকা ঘিরে ফেলে আন্দোলনকারীদের সরিয়ে দেয় এবং মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে পুরো ধ্বংসযজ্ঞ সম্পন্ন করে।
এই ঘটনায় পুরো জেলা জুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় বিশিষ্টজনেরা বলছেন, ভারতে বিশেষত উত্তরপ্রদেশে সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে একের পর এক মসজিদ ও মাদ্রাসা টার্গেট করা হচ্ছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও আইনি নিষ্পত্তির কথা বলা হলেও, প্রশাসনিকভাবে মুসলিমদের স্থান ও ধর্মীয় কাঠামো সংকুচিত করার এই প্রবণতা ভারতের সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
মতামত