ভারতের ত্রিপুরায় আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে গো-রক্ষার নামে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সহিংসতা। গত ২ সেপ্টেম্বর বুধবার ভোরের দিকে রাজ্যের কল্যাণপুর থানার অন্তর্গত বাবগের গ্রামে জালিলুর রহমান (৩৭) নামে এক মুসলিম গরু ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে একদল উগ্র জনতা। নিহত জালিলুর রহমান পার্শ্ববর্তী গিলাতলী বাজারের স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন।
স্থানীয় ও নিহতের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার ভোরে বাগান বাজারের সাপ্তাহিক পশুর হাটে বিক্রির উদ্দেশ্যে গবাদিপশু সংগ্রহ করতে বেরিয়েছিলেন জালিলুর। আগের দিন মঙ্গলবার তিনি স্থানীয় এক হিন্দু কৃষক অনুকূল দেবনাথের কাছ থেকে বৈধভাবে দুটি গরু ক্রয় করেন। হাটের দিন ভোরে আনুমানিক সাড়ে ৪টার দিকে তিনি যখন অনুকূল দেবনাথের বাড়ি থেকে গরু নিয়ে হাটের দিকে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই কয়েকজন স্থানীয় উগ্র ব্যক্তি তাকে ঘিরে ধরে এবং 'গরু চোর' বলে চিৎকার শুরু করে।
মুহূর্তের মধ্যে একদল সশস্ত্র জনতা জালিলুরকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং আমানুষিকভাবে মারধর শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জনতার হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে জালিলুর মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তার হাত ও পা ভেঙে দেওয়া হয়। রক্তসংকটাপন্ন অবস্থায়ও তিনি কোনোক্রমে মুঠোফোনে নিজ পরিবারকে এই হামলার কথা জানাতে সক্ষম হন। খবর পেয়ে জালিলুরের স্ত্রী ও শ্বশুর তাকে বাঁচাতে দ্রুত দুর্ঘটনাস্থলে ছুটে গেলে উগ্র জনতা তাদের ওপরও হামলা চালায় এবং মারধর করে।
পরবর্তীতে কল্যাণপুর থানার পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গুরুতর আহত অবস্থায় জালিলুরকে উদ্ধার করে স্থানীয় কল্যাণপুর হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই ঘটনায় জালিলুরের পরিবার গভীর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। জালিলুর যে মোটরসাইকেল নিয়ে গরু আনতে গিয়েছিলেন, পুলিশ সেটি পরবর্তীতে কৃষক অনুকূল দেবনাথের বাড়ি থেকে উদ্ধার করে। ঘটনার পর বাইকটি কে বা কারা সেখানে সরিয়ে নিল, তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নিহতের স্ত্রী ও দুই শিশু সন্তান এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে।
ঘটনার পর কল্যাণপুর থানায় একটি প্রথামিক এজাহার (FIR) দায়ের করা হয়েছে। জালিলুরের পরিবার ও স্থানীয় অধিকারকর্মীরা এ ঘটনাকে পরিকল্পিত 'মব লিঞ্চিং' বা জনতা কর্তৃক হত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করে অবিলম্বে জড়িত মূল অপরাধীদের গ্রেপ্তার ও কঠোর শাস্তির জোর দাবি জানিয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভারতে ক্রমাগত সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর এমন পরিকল্পিত হামলা ও গো-সুরক্ষার নামে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
মতামত