ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রশাসনিক পর্যালোচনার অজুহাতে প্রথম ধাপে ২৫২টি কওমি (খারিজী) মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার। একই সঙ্গে উপযুক্ত কাগজপত্র জমা দিতে না পারলে আরো ১০০টি মাদ্রাসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য কারণ দর্শানোর (শো-কজ) নোটিশ জারি করা হয়েছে। রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অনুমোদনের অভাব ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপকে সীমান্ত অঞ্চলে বসবাসকারী মুসলিম জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সামাজিক কাঠামোর ওপর পরিকল্পিত আঘাত বলে মনে করছেন স্থানীয় অধিকারকর্মীরা।
পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নজিরবিহীন চাপ সৃষ্টি করে রাজ্য সরকার প্রথম ধাপের সমীক্ষা শেষে ২৫২টি কওমি মাদ্রাসা সরাসরি বন্ধ করে দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে। রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে কলকাতা সহ ২২টি জেলায় পরিচালিত এক বিতর্কিত সমীক্ষার ভিত্তিতে এই কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, বন্ধ ঘোষণা করা ২৫২টি মাদ্রাসার সিংহভাগই ঐতিহ্যবাহী কওমি (খারিজী) ধারার। জেলাভিত্তিক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলো—
- মালদা: ৪৪টি মাদ্রাসা
- উত্তর দিনাজপুর: ৩৭টি মাদ্রাসা
- দক্ষিণ ২৪ পরগনা: ৩২টি মাদ্রাসা
- নদীয় ও মুর্শিদাবাদ: ২৫টি করে মাদ্রাসা
রাজ্যের সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু এই সিদ্ধান্তের সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, 'প্রথম ধাপের তথ্যের ভিত্তিতে ২৫২টি মাদ্রাসা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া গুরুতর অনিয়ম শনাক্ত হওয়ায় আরো ১০০টি সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তারা যদি বৈধ নথি দেখাতে ব্যর্থ হয়, তবে সেগুলোও বন্ধ করে দেওয়া হবে।' সরকারি হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে রাজ্যে ২,১৩২টি অনুমোদিত এবং ২,৩৯৬টি অনুমোদনহীন মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, চলতি বছরের জুন মাসে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পুরো পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে অনুমোদিত ও অনুমোদনহীন মাদ্রাসার ওপর ব্যাপক জরিপ চালানোর নির্দেশ দেন। এই সমীক্ষায় মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ, শিক্ষার্থীদের তথ্য, অর্থায়নের উৎস এবং অ্যাফিলিয়েশনের নথি যাচাইয়ের নামে কড়া নজরদারি শুরু হয়।
এই সিদ্ধান্ত সামনে আসতেই পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। কওমি মাদ্রাসাগুলোকে নিশানা করে ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের নেতারা উগ্র হিন্দুত্ববাদী বক্তব্য ছড়াতে শুরু করেছেন। বিজেপি রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে দাবি করেন, সীমান্ত এলাকায় 'উগ্রবাদ' রুখতেই সরকার এই ব্যবস্থা নিয়েছে। অন্যদিকে, বিজেপি নেত্রী ও রাজ্য মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পল ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, এই মাদ্রাসাগুলো নাকি 'দেশবিরোধী শিক্ষা ও সন্ত্রাসী আশ্রয়স্থল' হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কওমি মাদ্রাসাগুলো শত শত বছর ধরে ভারতীয় উপমহাদেশের প্রান্তিক মুসলিম শিশুদের বিনামূল্যে দ্বীনি শিক্ষা, খাদ্য ও বাসস্থান সরবরাহ করে আসছে। সাধারণ মুসলমানদের অনুদানে চালিত এসব স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে 'জঙ্গিবাদের কেন্দ্র' হিসেবে চিত্রায়িত করার হিন্দুত্ববাদী বয়ান মূলত মুসলিমদের মৌলিক শিক্ষা ও ধর্মীয় অধিকার হরণের এক গভীর চক্রান্ত।
মতামত