ভারতীয জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতা কিরীট সোমাইয়া 'ল্যান্ড জিহাদ' ষড়যন্ত্রের ভিত্তিহীন দোহাই দিয়ে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন একটি মসজিদের পানি সংযোগ কেটে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। সেই আবেদনের ভিত্তিতেই ব্রুহানমুম্বাই মিউনিসিপাল কর্পোরেশন (বিএমসি) এবার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে পানি সংযোগ বন্ধে জরুরি নির্দেশ জারি করেছে।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে মুসলিমদের ধর্মীয় স্থান ও আবাসস্থলগুলোকে 'অবৈধ অনুপ্রবেশ' বা 'অবৈধ দখলদারিত্ব' আখ্যা দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নেওয়ার যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, মুম্বাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন এই মসজিদটি এখন তার সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়েছে।
মিথ্যা অভিযোগ ও বিএমসির তোড়জোড়
বিজেপির সাবেক এমপি ও কট্টরপন্থী নেতা কিরীট সোমাইয়া সম্প্রতি অভিযোগ তোলেন যে, টার্মিনাল ২ সংলগ্ন মসজিদটির পানি সংযোগটি অবৈধ এবং এর মাধ্যমে পানি চুরি হচ্ছে। সোমাইয়ার এই সাম্প্রদায়িক সুরের পরপরই গত ১৭ সেপ্টেম্বর বিএমসি ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (সিএসএমআইএ) কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রদান করে।
বিএমসির চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৫ মিলিমিটার ব্যাসের পাইপের মাধ্যমে মসজিদে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে যা তাদের নথিপত্রে লিপিবদ্ধ নেই। আগামী ৭ দিনের মধ্যে এই সংযোগের অনুমতিপত্র দেখাতে অথবা সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। বিএমসি হুমকি দিয়েছে যে, ৭ দিনের মধ্যে নির্দেশ না মানলে তারা মিউনিসিপাল কর্পোরেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী যেকোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
একই সাথে কিরীট সোমাইয়া এয়ারপোর্ট অথরিটি অব ইন্ডিয়ার (এএআই) চেয়ারম্যান বিপন কুমারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন যে, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের ৫,০০০ বর্গফুট জমি এবং সেখানে অবস্থিত ৩,০০০ বর্গফুটের মসজিদ কাঠামোটি অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে হস্তান্তর করা হয়েছে। সোমাইয়া এটিকে 'ল্যান্ড জিহাদ মাফিয়া'দের কাজ বলে দাবি করেন এবং সংশ্লিষ্ট মুসলিম কর্মকর্তা মোহামদে সারওয়ারের বিরুদ্ধে সাহার থানায় এফআইআর (FIR) দায়েরের আবেদন জানান। এরপরই মুম্বাই মেট্রোপলিটন রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এমএমআরডিএ) সাহার থানা পুলিশকে ঘটনার তদন্ত করার নির্দেশ প্রদান করেছে।
'ল্যান্ড জিহাদ' শব্দটির নেপথ্যে মুসলিমবিদ্বেষী বাস্তবতা
প্রশাসনিক বা আইনগত ক্ষেত্রে 'ল্যান্ড জিহাদ' বলে কোনো বৈধ পরিভাষা নেই। এটি মূলত উগ্র হিন্দুত্ববাদীগোষ্ঠীর তৈরি একটি কাল্পনিক ও ষড়যন্ত্রমূলক প্রোপাগান্ডা। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—মুসলিমরা কীভাবে পরিকল্পিতভাবে সম্পত্তি কিনে বা বসতি স্থাপন করে জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তন করছে—এমন একটি কাল্পনিক ভয় ছড়িয়ে দেওয়া।
২০১৪ সালে বিজেপি ভারতে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই শব্দটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে চরমভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আসাম, জম্মু-কাশ্মীর সহ ভারতের বিভিন্ন রাজ্য নির্বাচনের সময় বিজেপি নেতারা জনসভায় নিয়মিত 'ল্যান্ড জিহাদ'-এর জুজু দেখিয়েছেন। এই ন্যারেটিভের আড়ালে বহু পুরোনো মসজিদ, দরগাহ, ওয়াকফ সম্পত্তি এবং প্রাচীন মুসলিম এলাকাগুলোকে 'অবৈধ দখল' বলে চিহ্নিত করে বুলডোজার চালানো হচ্ছে এবং নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে।
পরিকল্পিতভাবে মুসলিম স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু বানানোর ইতিহাস
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিজেপির কিরীট সোমাইয়া দীর্ঘদিন ধরেই মুম্বাই ও তার আশেপাশের অঞ্চলের মুসলিম স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে আসছেন। এর আগে তিনি গত কয়েক মাস ধরে মুম্বাইয়ের মসজিদগুলোতে মাইক বা লাউডস্পিকার ব্যবহারের বিরুদ্ধে একপেশে প্রচার চালিয়েছিলেন। শুধুমাত্র মানখুর্দ-গোভান্ডি এলাকাতেই তিনি ৭২টি মসজিদের বিরুদ্ধে মাইক ব্যবহারের অভিযোগ তুলে পুলিশের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। পুনে জেলায় ৩০৮টি মসজিদের তালিকা তৈরি করে সেগুলোকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা চালান তিনি।
স্থানীয় মসজিদ ট্রাস্টি ও বাসিন্দারা বিএমসি এবং বিজেপি নেতাদের এই কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তাদের মতে, রাজনীতিবিদেরা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে এবং আসন্ন রাজনৈতিক সুবিধা পেতে আইন ও প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরি করছেন। মসজিদ কমিটিগুলো সবসময়ই আদালতের নির্দেশনা মেনে কাজ করে আসছে, অথচ হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো সেটিকে অহেতুক রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাচ্ছে।
মতামত