জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানকে ‘নিশ্চিহ্ন’ করার হুমকির তীব্র জবাব দিয়েছেন ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। বুধবার দেওয়া নিজের ভাষণে ট্রাম্পের এই মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘আধিপত্যবাদী আচরণ’ ও ‘দম্ভের’ নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যা দেন তিনি। জাতিসংঘের মঞ্চে শহীদদের স্মৃতি ও আন্তর্জাতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরে পেজেশকিয়ান স্পষ্ট জানান, হুমকি বা চাপের মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না, বরং যেকোনো আগ্রাসনের যোগ্য জবাব দেবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তীব্র আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক বক্তব্যের জবাবে কঠোর হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। যুক্তরাষ্ট্রের দম্ভ ও হুমকি ইরানি জাতিকে কেবল আরও ঐক্যবদ্ধ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, ইতিহাস সাক্ষী ইরান কোনোদিন নতিস্বীকার করেনি এবং আগ্রাসীদের অনুতপ্ত হতে বাধ্য করার সক্ষমতা তেহরানের রয়েছে।
নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেওয়ার সময় পেজেশকিয়ান মার্কিন সামরিক আগ্রাসনের শিকার নিরপরাধ মানুষের কথা তুলে ধরেন। তিনি তার বক্তব্যের সূচনায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মিনারে একটি প্রাথমিক স্কুলে মার্কিন হামলায় নিহত কোমলমতি শিশুদের ছবি প্রদর্শন করেন। একই সঙ্গে তিনি ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিমুখী নীতির তীব্র সমালোচনা করেন।
ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, 'যখন আপনি মার্কিন আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নিজের মাতৃভূমি রক্ষা করতে যাবেন, তখনই ওয়াশিংটন সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ এবং ‘অঞ্চলের অনিরাপত্তা সৃষ্টি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এটি বিশ্ববাসীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চরম প্রতারণা।'
এর আগে মঙ্গলবার অধিবেশনে ভাষণ দিতে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে সম্পূর্ণভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুমকি দেন এবং বিশ্বসম্প্রদায়কে তেহরানের ওপর আরও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের আহ্বান জানান। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের জবাবে পেজেশকিয়ান বলেন, শত্রুপক্ষ এত দিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছে যে সংঘাত বা নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ইরানকে কাবু করা অসম্ভব। ইরান ঐতিহাসিকভাবেই কোনো আগ্রাসনের সমর্থক নয় এবং বিশ্বশান্তির স্বার্থে সবসময় সম্মানজনক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সম্মানজনক কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, 'ইরান সমমর্যাদার ভিত্তিতে যেকোনো বস্তুনিষ্ঠ সংলাপের জন্য প্রস্তুত। তবে কোনো রাষ্ট্র যদি শক্তি প্রদর্শন বা হুমকির ভাষায় কথা বলতে চায়, তেহরান তা বিন্দুমাত্র বরদাশত করবে না।'
মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোর সম্মিলিত সুরক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পেজেশকিয়ান বলেন, 'এই অঞ্চলে আংশিক নিরাপত্তার কোনো সুযোগ নেই। হয় আমরা এই অঞ্চলের সব দেশ মিলে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলব, নয়তো মার্কিন হস্তক্ষেপের কারণে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে নিরাপত্তাহীনতার চরম খেসারত দিতে হবে।'
ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, তেহরান পারমাণবিক বোমার দিকে যাচ্ছে না, তবে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত অধিকার থেকে ইরানকে এক চুলও পেছনে হঠানো যাবে না। পারমাণবিক প্রযুক্তিকে কয়েকটি পশ্চিমা শক্তির একচেটিয়া সম্পদে পরিণত করার প্রক্রিয়ার তীব্র বিরোধিতা করেন তিনি।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) দ্বিচারিতার কড়া সমালোচনা করে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যে প্রকৃত পারমাণবিক বোমার মালিক ইসরায়েল। অবৈধ এই রাষ্ট্রটি ফিলিস্তিনে প্রতিদিন গণহত্যা চালালেও তাদের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলো কখনো পরিদর্শনের আওতায় আনা হয় না। অথচ শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য নির্ধারিত ইরানের কেন্দ্রগুলোতে প্রতিনিয়ত পরিদর্শন চালানো হয় এবং অন্যায্য নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়।'
বক্তব্যের শেষভাগে তিনি দৃঢ় কণ্ঠে জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বাহ্যিক চাপ, অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল কিংবা কোনো ধরনের সামরিক হুমকি ইরানি জাতির সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নকে রুদ্ধ করতে পারবে না।
মতামত