ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই সংখ্যালঘু খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর হামলা ও সঙ্ঘবদ্ধ হয়রানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়া হেট ল্যাবের (আইএইচএল) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় অন্তত ৬০টি খ্রিস্টানবিরোধী সহিংসতা ও আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরব ভূমিকা ও পক্ষপাতমূলক আচরণকে দায়ী করা হয়েছে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সংখ্যালঘু খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর নির্যাতন ও সহিংসতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ সংস্থা ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ (আইএইচএল) প্রকাশিত এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র। ২০২৬ সালের ১৩ মে থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজ্যের ১৩টি জেলায় খ্রিস্টানদের লক্ষ্য করে অন্তত ৬০টি পৃথক হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে সংস্থাটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কট্টরপন্থী অপরাধীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামলা ও হুমকির সময় রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি সরাসরি উল্লেখ করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছে। আইএইচএল-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নথিভুক্ত ৬০টি ঘটনার মধ্যে ৫২টিই ছিল খ্রিস্টানদের ব্যক্তিগত প্রার্থনা সভা, ঘরবাড়ি, গীর্জা এবং ধর্মীয় সমাবেশে কট্টরপন্থীদের বেআইনি অভিযান। এছাড়া ৮টি ঘটনার ক্ষেত্রে সরাসরি শারীরিক হামলা, দলবদ্ধ সহিংসতা ও ব্যাপক ভাঙচুরের প্রমাণ মিলেছে। সহিংস হামলার পাশাপাশি ৫টি স্থানে প্রকাশ্যে খ্রিস্টানবিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য (Hate Speech) প্রচার করা হয় এবং তথাকথিত 'ধর্মান্তরের' ভুয়া অভিযোগে ৩টি বড় ধরনের উস্কানিমূলক বিক্ষোভ সমাবেশ সংগঠিত করা হয়।
ভৌগোলিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা। এই দুই জেলার প্রতিটিতেই অন্তত ১৩টি করে প্রার্থনা সভায় হামলা চালানো হয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), বজরং দল, হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং হিন্দু সংহতির কর্মীরা বেআইনিভাবে প্রার্থনাসভায় ঢুকে সংগঠকদের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরের অভিযোগ আনে। এমনকি উপস্থিত সাধারণ নাগরিকদের জাতীয় পরিচয়পত্র বা 'আধার কার্ড' দেখানোর জন্য বেআইনিভাবে চাপ সৃষ্টি করে।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে খ্রিস্টান নারীদের ওপর চলা মানসিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়নের চিত্র। শাঁখা-পোলা ও সিঁদুরের মতো ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক ও বিবাহ চিহ্ন ব্যবহার নিয়ে খ্রিস্টান নারীদের ক্রমাগত হয়রানি করা হয়েছে। বারুইপুরের একটি ঘটনায় নারীদের 'বীজাত হিন্দু' (জাত তুলে বর্ণবাদী ও আপত্তিকর গালি) বলে চরম অপমান করা হয়।
ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতার বিবরণ দিতে গিয়ে প্রতিবেদনে বেশ কিছু নৃশংস ঘটনার উল্লেখ করা হয়। দক্ষিণ ২৪ পরগনার একটি পূর্ণাঙ্গ গীর্জায় ভাঙচুর, সুভাষগ্রামে একটি নির্মাণাধীন গীর্জার ক্রুশ বা ধর্মীয় প্রতীক ভেঙে ফেলা এবং হাওড়ার একটি মর্মান্তিক ঘটনার কথা উঠে এসেছে। হাওড়ায় তথাকথিত ধর্মান্তরের অভিযোগে দু'জন ব্যক্তিকে জনসম্মুখে উলঙ্গ করে নির্দয়ভাবে প্রহার করা হয়। চরম উদ্বেগের বিষয় হলো, স্থানীয় পুলিশের উপস্থিতিতেই উগ্র জনতা এই নির্যাতন চালায়, কিন্তু পুলিশ আক্রান্তদের বাঁচাতে কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি।
সংস্থাটি জানায়, ঘটনার সময় পুলিশ নিষ্ক্রিয় দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে এবং পরবর্তীতে হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর মিথ্যা অভিযোগের ভিত্তিতে উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত খ্রিস্টানদেরই গ্রেপ্তার ও আটক করে। রানীগঞ্জ, চৈতন্যপুর ও মেদিনীপুরে পুলিশ ও কট্টরপন্থীদের এই অনৈতিক আঁতাতের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, অপরাধীরা চরম প্রাতিষ্ঠানিক ছাড় বা 'বিচারের ঊর্ধ্বে' থাকার সুযোগ নিয়ে এসব তাণ্ডব চালিয়েছে। প্রতিটি সহিংসতার ভিডিও অপরাধীরা নিজেরাই ধারণ করে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছে, এমনকি কয়েকটি ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার (Livestream) করা হয়েছে। আইএইচএল মন্তব্য করেছে যে, সমগ্র রাজ্য জুড়ে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে প্রাতিষ্ঠানিক মদদে সংখ্যালঘুদের উৎখাত ও কণ্ঠরোধের এই ঘৃণ্য প্রচার চালানো হচ্ছে।
মতামত