ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত শতাব্দীরও বেশি পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ‘রেসকোর্স মসজিদ’ বুলডোজার হামলার মুখে পড়েছে। গত ১৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে অবৈধ দাবি করে আকস্মিক উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হলে মুসলিম সমাজে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। এই সংকটময় পরিস্থিতিতে মসজিদ রক্ষার দাবিতে মুখ খুলেছেন সংলগ্ন মন্দিরের গত ১৫ বছরের পুরোহিত কেশব রাজ শাস্ত্রী, যা ধর্মীয় সম্প্রীতির এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণ ও উপাসনালয় ভাঙার নানা ঘটনার মাঝে এক ব্যতিক্রমী মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির চিত্র দেখা গেল নতুন দিল্লিতে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ৭, লোক কল্যাণ মার্গের কাছে ৫৩ একর জায়গাজুড়ে অবস্থিত দিল্লি রেসকোর্স ক্লাবের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে শতবর্ষী ‘রেসকোর্স মসজিদ’। জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে এই পুরো এলাকা ও আশপাশের বস্তিগুলো উচ্ছেদের ঘোষণা দিয়েছে কেন্দ্র সরকার।
এমন এক চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মুখে মসজিদের পাশে অবস্থিত মন্দিরের প্রধান পুরোহিত কেশব রাজ শাস্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, তিনি এই ঐতিহাসিক মসজিদ ও এর ইমামের পাশে আছেন। সংবাদমাধ্যমকে তিনি পরিষ্কার ভাষায় বলেন, 'মসজিদ আর মন্দির তো কখনো ভাঙা উচিত নয়। মাওলানা সাহেব আমার পুরোনো বন্ধু। আমরা একে অপরের বাড়ি যাই, কথা বলি।' তিনি জানান, এলাকার কোনো কখনো কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মন্দিরের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দেওয়া হলেও তাকে বা তার পরিবারকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়নি এবং পূজা-পার্বণ চালাতে পারছেন। তবে স্পষ্ট কণ্ঠে তিনি জানিয়ে দেন, 'কিন্তু আমি মসজিদের সমর্থনে আছি।'
ঐতিহ্যগত মর্যাদা ও উচ্ছেদ নোটিশের দ্বন্দ্ব
ব্রিটিশ আমলেরও পুরোনো এই মসজিদটি ২০০৯ সালে তালিকাভুক্ত একটি গ্রেড-টু হেরিটেজ কাঠামো। দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডে নিবন্ধিত এই মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৮০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। এটি এনডিএমসি-র (NDMC) হেরিটেজ রেজিস্টারেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অথচ গত ১৯ অক্টোবর ফেডারেল ল্যান্ড অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিস (L&DO) মাত্র ছয় দিনের একটি উচ্ছেদ নোটিশ জারি করে সরকারি জমির ওপর অবস্থিত এই প্রাঙ্গণকে ‘অনুমোদিত নয়’ বলে ঘোষণা করে।
ইমাম ও বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২১ সালের একটি সরকারি সার্ভেতেও এই মসজিদটিকে অবৈধ বা জবরদখলকৃত হিসেবে দেখানো হয়নি। এমনকি ১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেটের ঐতিহ্যবাহী তালিকার ভেতরেও এর নাম রয়েছে। ইতোমধ্যে গত ৭ অক্টোবর আশপাশের ঝুজ্ঞি (বস্তি) উচ্ছেদের সময় মসজিদটির পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এরপর থেকে মুসল্লিরা জেনারেটর ও ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থা করে অজুর কাজ চালাচ্ছেন, কিন্তু বেশিরভাগ নামাজই তাদের অন্ধকারে আদায় করতে হচ্ছে।
গত ৮ অক্টোবর দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড এনডিএমসির কাছে বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরুদ্ধারের আবেদন জানায়। কিন্তু ১৫ অক্টোবর এনডিএমসি তা নাকচ করে জানায় যে, demolition বা ভাঙার কাজ চলমান থাকায় জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে বিদ্যুৎ সংযোগ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। মসজিদের ইমাম দিল্লি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হলেও আদালত গত ১৫ অক্টোবর সংযোগ পুনরুদ্ধারের আদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানান। ২২ অক্টোবর এনডিএমসি পুনরায় আদালতকে জানায় যে, নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ দেওয়া ঝুঁকি তৈরি করবে।
ব্যাপক উচ্ছেদ অভিযান ও মুসল্লিদের আকুতি
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের বিপরীতে থাকা ঝুজ্ঞি ক্লাস্টারের প্রায় ৭০০ পরিবারকে ইতোমধ্যে উচ্ছেদ করে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে সাভদা গেভরায় পুনর্বাসন করা হয়েছে। গত ২৫ আগস্ট দিল্লি হাইকোর্টের এক রায়ের পর থেকেই এলঅ্যান্ডডিও এই উচ্ছেদ কার্যক্রম জোরদার করেছে।
গত ২৩ অক্টোবর (শুক্রবার) জুমার নামাজের সময় ইমাম মোহাম্মদ হারুন চোখের জলে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করেন। তিনি আকুতি জানিয়ে বলেন, 'হে আল্লাহ, আমাদের সাহায্য করুন। আপনিই আমাদের একমাত্র ভরসা। আমাদের ইমান পরীক্ষা করা হচ্ছে।' পরের দিনগুলোতেও কঠোর পুলিশি পাহারার মধ্য দিয়ে নামাজ পড়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে ১৬৩ ধারা জারি থাকায় আসরের নামাজে ১৫ মিনিটের জন্য ১০ জনের কম মানুষকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় এবং মাগরিবের সময় অনেক মুসল্লিকে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অনুমতির কথা বলে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা
গত ১৯ অক্টোবর জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের একটি প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থান রক্ষা এবং সুযোগ-সুবিধা পুনর্বহালের দাবি জানায়। জমিয়তের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মন্ত্রী এ বিষয়ে ‘সর্বাত্মক প্রচেষ্টা’ চালানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
এআইএমআইএম (AIMIM) প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াওসিও অবিলম্বে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে জানান যে, ২০২৩ সাল থেকে দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড গঠিত না হলেও এই মসজিদটি ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ হিসেবে পূর্ণ আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখে। আম আদমি পার্টির (AAP) নেতা ও ওয়াকফ বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান আমানতুল্লাহ খানও সোশ্যাল মিডিয়ায় জানান যে, মসজিদটি স্বাধীনতার আগের এবং এনডিএমসি-র ঐতিহ্যবাহী তালিকায় রয়েছে।
রোববার পর্যন্ত মসজিদটির সরাসরি ভাঙার কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি আদেশ প্রকাশ্যে আসেনি। তবে জমির আইনি অবস্থান এবং হেরিটেজ স্বীকৃতি নিয়ে চলা তীব্র বিরোধের জেরে মসজিদটির ভবিষ্যৎ এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এমন কঠিন সময়ে মন্দির পুরোহিত শাস্ত্রীর এই সাহসী অবস্থান মুসলিম প্রতিবেশীদের হৃদয়ে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি আস্থার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মতামত