পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.)-এর জামার ঘটনাগুলো থেকে ধৈর্য, পবিত্রতা, ক্ষমা এবং আল্লাহর অপার কৌশল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরেছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুলবারি বিন আওয়াদ আল-সুবাইতি। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) মসজিদে নববীতে জুমার খুতবায় তিনি এসব বিষয় আলোচনা করেন। ইউসুফ (আ.)-এর জামা কীভাবে তিনটি ভিন্ন সময়ে সত্যের সাক্ষী, নির্দোষিতার প্রমাণ এবং সুসংবাদবাহক হয়েছিল, তা ব্যাখ্যা করেন তিনি।
ইউসুফ (আ.)-এর জামায় রয়েছে ঈমানি ও নৈতিক শিক্ষার অনন্য দৃষ্টান্ত
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ইউসুফ (আ.)-এর জামার ঘটনাগুলোতে নিহিত ঈমানি ও নৈতিক শিক্ষার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুলবারি বিন আওয়াদ আল-সুবাইতি। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে ধৈর্য, চারিত্রিক পবিত্রতা, ক্ষমাশীলতা এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও পরিকল্পনার ওপর অবিচল বিশ্বাসের শিক্ষা পাওয়া যায় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) পবিত্র মসজিদে নববীতে জুমার খুতবা প্রদানকালে তিনি এসব বিষয়ে আলোচনা করেন।
খুতবায় তিনি মহান আল্লাহর কাছে নিরাপত্তা ও ঈমানের নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে মুসলমানদের তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দেন। তিনি বলেন, তাকওয়া একজন মুমিনের পাথেয়, অন্তর্দৃষ্টির আলো এবং ফিতনা থেকে রক্ষার ঢাল। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে বলেন, 'তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আল্লাহ তোমাদের শিক্ষা দেবেন।' (সুরা আল-বাকারা, ২:২৮২)
ইউসুফ (আ.)-এর জামার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা
শায়খ আল-সুবাইতি বলেন, ইউসুফ (আ.)-এর জামার ঘটনা পবিত্র কোরআনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে এসেছে। প্রতিটি ঘটনাই বহন করে স্বতন্ত্র শিক্ষা ও তাৎপর্য।
প্রথমবার তাঁর ভাইয়েরা তাঁকে কূপে ফেলে দেওয়ার পর জামাটি তাঁর ভাইদের মিথ্যা দাবির বিপরীতে সাক্ষ্য হিসেবে সামনে আসে। দ্বিতীয়বার মিসরের শাসকের স্ত্রীর প্রলোভনের ঘটনায় জামাটি ইউসুফ (আ.)-এর নির্দোষিতা ও চারিত্রিক পবিত্রতার প্রমাণ হয়ে ওঠে। আর তৃতীয়বার জামাটি তাঁর বাবা ইয়াকুব (আ.)-এর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সুসংবাদ নিয়ে আসে।
হিংসা সম্পর্ক নষ্ট করে, যাচাই ছাড়া সিদ্ধান্ত নয়
খতিব বলেন, কাহিনির শুরুতেই রয়েছে প্রজ্ঞা ও নেয়ামত সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। ইউসুফ (আ.) স্বপ্নে এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদকে নিজের সামনে সিজদা করতে দেখেছিলেন। তিনি বাবাকে সেই স্বপ্নের কথা জানালে ইয়াকুব (আ.) তাঁকে ভাইদের কাছে স্বপ্নটি প্রকাশ না করার পরামর্শ দেন। কারণ, তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এতে ভাইদের মধ্যে হিংসা সৃষ্টি হতে পারে।
পবিত্র কোরআনে ইউসুফ (আ.)-এর বক্তব্য এভাবে এসেছে:
'হে আমার পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি, এগারোটি নক্ষত্র, সূর্য ও চাঁদ আমাকে সিজদা করছে।' (সুরা ইউসুফ, ১২:৪)
তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষের অন্তরে হিংসা জায়গা করে নিলে তা পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করে দেয় এবং একপর্যায়ে জুলুম ও আগ্রাসনের কারণ হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি চোখের পানি ফেলে বা কৃত্রিমভাবে কান্না করে, সে-ই যে নির্যাতিত, এমন নয়। আবার যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, সে-ই যে অপরাধী, তাও নিশ্চিত নয়।
বিশেষ করে বর্তমান সময়ে গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকায় যেকোনো সংবাদ যাচাই করা এবং তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কূপ থেকে প্রাসাদে: আল্লাহর অদৃশ্য পরিকল্পনার অনন্য দৃষ্টান্ত
ইউসুফ (আ.)-এর কূপ থেকে বের হয়ে মিসরের শাসকের বাড়িতে পৌঁছানোর ঘটনাকে আল্লাহর তাকদিরের অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্ময়কর নিদর্শন হিসেবে বর্ণনা করেন শায়খ আল-সুবাইতি।
তিনি বলেন, মানুষ অনেক সময় বুঝতে পারে না তার মুক্তি বা স্বস্তি কোন দিক থেকে আসবে। এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেটিকে মানুষ প্রথমে সম্পূর্ণ অকল্যাণকর মনে করে, কিন্তু সময়ের ব্যবধানে দেখা যায়, তার পেছনে ছিল বড় কোনো কল্যাণ।
তাই জীবনে বিপদ বা প্রতিকূলতা নেমে এলে আল্লাহর ফয়সালা সম্পর্কে তাড়াহুড়া করে নেতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। মানুষের চোখে যে ঘটনা কেবল কষ্টের মনে হয়, তার আড়ালেও আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও কল্যাণ লুকিয়ে থাকতে পারে।
প্রলোভনের মুখেও চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার শিক্ষা
খতিব ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার কথা তুলে ধরেন। মিসরের শাসকের বাড়িতে অবস্থানকালে তাঁকে যে প্রলোভনের মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেই ঘটনায় তাঁর অবস্থান তাকওয়া ও আত্মসংযমের প্রকৃত দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।
তিনি বলেন, মানুষ যখন একান্তে থাকে এবং পাপের সুযোগ তার সামনে উপস্থিত হয়, তখনই তার চারিত্রিক পবিত্রতার প্রকৃত পরীক্ষা হয়।
এ কারণে মুসলমানদের ফিতনার স্থান ও পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকার এবং পাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে এমন পথ ও উপায় বন্ধ রাখার আহ্বান জানান তিনি। এর মাধ্যমে দ্বীন, জীবন ও সম্মান রক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
কারাগারেও কল্যাণের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন ইউসুফ (আ.)
শায়খ আল-সুবাইতি বলেন, ইউসুফ (আ.)-এর জীবনের ধারাবাহিক পরীক্ষাগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁকে ক্ষমতা ও মর্যাদার উচ্চ অবস্থানে পৌঁছে দেয়। অনেক সময় মানুষ কোনো ঘটনার প্রকৃত তাৎপর্য তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারে না।
তিনি উল্লেখ করেন, কারাগারেও ইউসুফ (আ.) মানুষের কল্যাণ, সদাচরণ ও সঠিক দিকনির্দেশনার কাজ অব্যাহত রেখেছিলেন। কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আশপাশের মানুষের জন্য উপকারী ছিলেন।
এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
'নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান নষ্ট করেন না।' (সুরা ইউসুফ, ১২:৯০)
প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ভাইদের ক্ষমা করেছিলেন
ইউসুফ (আ.)-এর ভাইদের সঙ্গে পরবর্তী সময়ে তাঁর আচরণের বিষয়টিও খুতবায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
শায়খ আল-সুবাইতি বলেন, আল্লাহ যখন ইউসুফ (আ.)-কে পৃথিবীতে ক্ষমতা ও মর্যাদা দান করেন, তখন তিনি অতীতে তাঁর প্রতি অন্যায় করা ভাইদের কাছ থেকে প্রতিশোধ নেননি। বরং তাদের ক্ষমা করে দেন।
তিনি ভাইদের বলেছিলেন:
'আজ তোমাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' (সুরা ইউসুফ, ১২:৯২)
খতিব বলেন, ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ক্ষমা করতে পারা মহান চরিত্রের পরিচয়। অতীতের ভুল ও অপরাধ ক্ষমা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে সংশোধন, সম্পর্ক পুনর্গঠন এবং পারিবারিক বন্ধন পুনরায় দৃঢ় করা সম্ভব।
ইয়াকুব (আ.)-এর দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সুসংবাদ নিয়ে আসে জামা
ইউসুফ (আ.) তাঁর জামা বাবার কাছে পাঠানোর ঘটনাকে দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পরিবার পুনর্মিলনের সুসংবাদ এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থার অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরেন খতিব।
তিনি বলেন, এ ঘটনা আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ না হওয়ার শিক্ষা দেয়। জামাটি ছিল দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার একটি মাধ্যম বা উপলক্ষ। তবে প্রকৃত আরোগ্য ও সুস্থতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই।
আল্লাহর ওপর ভরসা ও তাঁর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার প্রতি বিশ্বাস
ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনির শেষাংশে ধৈর্য, দৃঢ় বিশ্বাস এবং আল্লাহর প্রতি উত্তম ধারণা পোষণের অসাধারণ শিক্ষা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন শায়খ আল-সুবাইতি।
তিনি পবিত্র কোরআনের এই আয়াত উদ্ধৃত করেন:
'নিশ্চয়ই আমার রব যা ইচ্ছা করেন, তা সূক্ষ্মভাবে সম্পন্ন করেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।' (সুরা ইউসুফ, ১২:১০০)
তিনি বলেন, ইউসুফ (আ.)-এর জামার ঘটনাগুলোর মধ্য দিয়ে আল্লাহর অসাধারণ পরিকল্পনা ও পরিচালনার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য এমন সব উপায় ও মাধ্যম তৈরি করে দেন, যা সম্পর্কে তারা আগে থেকে কিছুই জানে না।
মুমিনদের জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহর অনুগ্রহ ও সূক্ষ্ম ব্যবস্থাপনা পরিবেষ্টিত থাকে। তাই প্রতিকূল অবস্থায়ও আল্লাহর ওপর আস্থা ও বিশ্বাস অটুট রাখা প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনিদের জন্য দোয়া, সৌদি আরব ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা কামনা
খুতবায় শেষাংশে শায়খ আল-সুবাইতি ইসলামের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং মুসলমানদের কল্যাণের জন্য মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন।
তিনি সৌদি আরবকে ষড়যন্ত্রকারী ও অনিষ্টকারীদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করার, দেশটিকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ রাখার এবং মুসলিম বিশ্বের সব দেশে কল্যাণ, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা দানের প্রার্থনা করেন।
যারা দেশটির ক্ষতি করতে চায়, তাদের ষড়যন্ত্র ও অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দেওয়ার জন্যও দোয়া করেন তিনি।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনের জনগণের পাশে আল্লাহর সাহায্য, সমর্থন ও সহযোগিতা কামনা করেন।
সৌদি বাদশাহ ও দুই পবিত্র মসজিদের খাদেম এবং যুবরাজের জন্যও দোয়া করেন তিনি। তাঁরা যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে কাজ করতে পারেন এবং তাঁদের মাধ্যমে ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণ সাধিত হয়, সেই প্রার্থনার মধ্য দিয়ে জুমার খুতবা শেষ করেন মসজিদে নববীর এই খতিব।
মতামত