ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের ফতেহগড় সাহেব জেলার জাকওয়ালি গ্রামে সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের এক বিরল ও অভূতপূর্ব দৃশ্য উন্মোচিত হয়েছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সময় চরম সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মুখে শিখ প্রতিবেশীদের আশ্রয়ে জীবন বাঁচানো ৮৭ বছর বয়সী গুজ্জো খান আজ নিজের গ্রামে পুনরায় আজানের সুর শোনার প্রহর গুনছেন। স্থানীয় অমুসলিম—বিশেষ করে শিখ ও হিন্দু প্রতিবেশীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে জমি দান, অর্থ সংগ্রহ ও নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের মাধ্যমে এই গ্রামের মুসলিম পরিবারের জন্য একটি নতুন মসজিদ নির্মাণে সরাসরি ভূমিকা রাখছেন।
ভারতের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে বর্ধমান উগ্র হিন্দুত্ববাদী এবং মুসলিমবিদ্বেষী মেরুকরণের পরিবেশের মধ্যেও পাঞ্জাবের গ্রামীণ জনপদে বেঁচে আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষা এবং অসাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য।
জাকওয়ালি গ্রামের ৮৭ বছর বয়সী প্রবীণ মুসলিম অধিবাসী গুজ্জো খানের জন্য এই মসজিদ কেবল একটি ইবাদতখানা নয়; এটি তার শৈশবের হারানো স্মৃতি, শৈশবে পিতা-মাতাকে হারানোর বেদনা এবং শিখ প্রতিবেশীদের অকৃত্রিম মানবিকতার এক অমর প্রতীক।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের অরাজকতার সময় গুজ্জো খানের বয়স ছিল মাত্র আট বছর। প্রাণরক্ষার তাগিদে তার পিতা-মাতা তাকে ও তার দুই ভাইকে নিজ গ্রাম 'তেরা মালভিয়া' থেকে জাকওয়ালি গ্রামে পাঠায়। সহিংসতায় গুজ্জো খানের পিতা-মাতা নির্মমভাবে প্রাণ হারান, তবে জাকওয়ালির শিখ প্রতিবেশীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই তিন এতিম শিশুকে সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের হাত থেকে লুকিয়ে রেখে রক্ষা করেন।
গুজ্জো খান স্মৃতিচারণ করে বলেন, 'আমার শৈশবের শেষ আজান শুনেছিলাম ৮ বছর বয়সে। আজ দীর্ঘ আট দশক পর আমার নিজের গ্রামে আবারও আজানের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হবে—এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কিছু হতে পারে না।'
জাকওয়ালি গ্রামে বর্তমানে ১৮টি মুসলিম পরিবার বসবাস করে। দীর্ঘ তিন দশক ধরে গ্রামে একটি মসজিদের প্রয়োজন অনুভূত হলেও কোনো নিজস্ব উপাসনালয় ছিল না। সালাত আদায় ও জুমার জামাতে শরিক হতে স্থানীয় মুসলিমদের পার্শ্ববর্তী গ্রামে প্রায় চার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। বর্তমানে গ্রামে একটি গুরুদুয়ারা, একটি শিব মন্দির এবং একটি দরগাহ থাকলেও কোনো মসজিদ ছিল না।
এই অচলাবস্থা দূর করতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন গ্রামের ৭৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা বিবি রাজিন্দর কৌর। তিনি তার নাতিকে রাজি করিয়ে পরিবারের কৃষি জমির একটি অংশ মসজিদ নির্মাণের জন্য দান করেন। বিবি কৌর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে বলেন, 'কাউকে ইবাদতের জায়গা করে দেওয়া সবচেয়ে মহৎ কাজ। ১৯৪৭ সালের সেই রক্তক্ষয়ী ঘটনার ক্ষত দূর করতে আমাদের ইতিবাচক কিছু করা দরকার ছিল।'
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কৌরের পরিবার প্রায় ৫ মারলা জমি আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদ কমিটির নামে হস্তান্তর করে। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর পাঞ্জাবের শাহি ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ উসমান রহমানি লুধিয়ানভি এই মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। শিখ ও হিন্দু অধিবাসীরা ইট, সিমেন্ট এবং নগদ অর্থ দিয়ে এই নির্মাণকাজে অংশ নেন।
পাঞ্জাবজুড়ে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা
কেবল জাকওয়ালি নয়, পাঞ্জাবের অন্যান্য গ্রামেও মুসলিমদের অধিকার রক্ষায় অমুসলিমদের এগিয়ে আসার একাধিক নজির রয়েছে:
- পুনাওয়ালা গ্রাম (সংরুর জেলা): জাকওয়ালি থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামে মাত্র অল্প কয়েকটি মুসলিম পরিবার বাস করে। স্থানীয় হিন্দু পুরোহিত পরিবারের সন্তান ৪৫ বছর বয়সী জসপাল শর্মা তার নিজস্ব জমির একটি অংশ মসজিদ নির্মাণের জন্য দান করেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মসজিদটি উদ্বোধন করা হয় এবং উদ্বোধন উপলক্ষে জসপাল শর্মা সমগ্র গ্রামবাসীকে নৈশভোজে আপ্যায়িত করেন। বর্তমানে জসপাল শর্মার ঘরের ঠিক বিপরীতেই দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি এবং প্রতিদিন পাঁচবার আজানের শব্দ শুনতে পেয়ে তিনি গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন।
- উমরপুরা গ্রাম (মালেরকোটলা): শিখ ভাই সুখজিন্দর সিং পান্ধের ও তার ভাই স্থানীয় একটি ইবাদতখানা পুনর্নির্মাণে আর্থিক ও দৈহিক সহায়তা প্রদান করেন। পান্ধের জানান, তারা ঈদুল ফিতর এবং গুরুপুরব একসাথে উদযাপন করেন এবং জাতীয় পর্যায়ে রাজনীতি যাই হোক না কেন, স্থানীয় পর্যায়ে তারা ভালোবাসা ও একতার সাথেই বাস করতে চান।
পাঞ্জাবের বর্তমান শাহি ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ উসমান রহমানি লুধিয়ানভি জানান, দেশভাগের সময় লাখ লাখ মুসলিম ভারতের পাঞ্জাব ত্যাগ করতে বাধ্য হওয়ায় বহু মসজিদ পরিত্যক্ত বা গোয়ালঘরে পরিণত হয়েছিল। তবে গত নয় বছরে সাবেক শাহি ইমাম মাওলানা হাবিবুর রহমান সানি লুধিয়ানভির উদ্যোগে অমুসলিম প্রতিবেশীদের সহযোগিতায় ১৬৫টিরও বেশি মসজিদ পুনর্নির্মাণ ও পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়েছে।
ইমাম লুধিয়ানভি বলেন, 'ইন্টারনেট ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মীয় মেরুকরণ স্পষ্ট হলেও, গ্রামীণ পাঞ্জাবের সাধারণ মানুষ এখনো একে অপরকে রক্ষা ও সহযোগিতা করার সত্য পথটিকেই বেছে নিচ্ছেন।'
উপমহাদেশজুড়ে যখন রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলে সংখ্যালঘু ও মুসলিমদের অধিকার হরণের অপচেষ্টা চলছে, তখন পাঞ্জাবের সাধারণ অধিবাসীদের এই উদ্যোগ প্রমাণ করে যে, মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং প্রতিবেশীর ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধই উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী জবাব।
মতামত