কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সনদকে সরকারি ও বেসরকারি মাদরাসার দুটি পদে নিয়োগের যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের তৃতীয় দিনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এ তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. মনিরুল হক চৌধুরীর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা সরকার করছে।
এর আগে সংসদের অধিবেশন বিকেল সাড়ে ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হয়। অধিবেশনের শুরুতে প্রথম আধা ঘণ্টায় প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোকাল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধানমন্ত্রী চারটি লিখিত প্রশ্ন এবং ছয়টি সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি জবাব দেন।
মনিরুল হক চৌধুরীর লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের সব কওমি মাদরাসার সমন্বয়, উন্নয়ন ও পাবলিক পরীক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে ২০০৬ সালে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ‘কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বাংলাদেশ’ নামে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীতে ‘আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি‘আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর অধীন কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদানের জন্য ‘কওমি মাদরাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল)-এর সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি)-এর সমমান প্রদান আইন, ২০১৮’ প্রণয়ন করা হয়।
ওই আইনের মাধ্যমে ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
স্বীকৃত ছয়টি বোর্ড হলো—
১. বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ
২. বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া গওহরডাঙ্গা বাংলাদেশ
৩. আঞ্জুমানে ইত্তেহাদুল মাদারিস বাংলাদেশ
৪. আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালীম বাংলাদেশ
৫. তানযীমুল মাদারিসিদ দ্বীনিয়া বাংলাদেশ
৬. জাতীয় দ্বীনি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ
দুই পদে কওমি সনদের স্বীকৃতি
প্রধানমন্ত্রী জানান, গত ২৩ জুন ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদরাসা) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা, ২০২৬’ সংশোধন করা হয়েছে।
সংশোধিত নীতিমালায় সহকারী মৌলভী (ক্বারী) এবং ইবতেদায়ী ক্বারী পদে নিয়োগের কাম্য যোগ্যতা হিসেবে ওই ছয়টি কওমি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের সনদকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে সংশ্লিষ্ট যোগ্যতা পূরণকারী কওমি মাদরাসার সনদধারীদের এসব পদে নিয়োগের জন্য আবেদন করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এসব পদে কওমি মাদরাসার দাওরায়ে হাদিস (তাকমীল) ডিগ্রির পাশাপাশি ইলমে কিরাআত অথবা হিফজুল কোরআন সনদপ্রাপ্তদেরও নিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
কর্মসংস্থানের নতুন সম্ভাবনা
কওমি মাদরাসার সনদকে চাকরির যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে কওমি শিক্ষার্থীদের জাতীয় কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের সুযোগ আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট দুটি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে যে যোগ্যতা ও স্বীকৃতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, নতুন নীতিমালায় ছয়টি কওমি শিক্ষা বোর্ডের সনদ অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি চাকরির ক্ষেত্রেও নতুন সুযোগ তৈরি হলো।
এদিকে শুধু দেশের কর্মসংস্থান নয়, কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীদের বিদেশে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ধর্মীয় শিক্ষা আরও উন্নয়নের বিষয়ে আলোচনা
লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়ার এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী দেশের নিয়মিত শিক্ষাব্যবস্থায় ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি নিয়েও কথা বলেন।
তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়মিত সিলেবাসের মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। তবে এটিকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায়, তা পর্যালোচনা করা যেতে পারে।
ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণ
ইবতেদায়ী মাদরাসা জাতীয়করণের বিষয়ে কুড়িগ্রাম-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাহবুবুল আলমের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি নিয়ে আলাদাভাবে নোটিশ দেওয়ার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, সংসদ সদস্য আলাদা নোটিশ দিলে তিনি পুরো বিষয়টি সঠিকভাবে খোঁজখবর করে সংসদের সামনে উপস্থাপন করবেন।
সব মিলিয়ে কওমি মাদরাসার ছয়টি শিক্ষা বোর্ডের সনদের চাকরির যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি এবং দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা কওমি শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের পরিধি বাড়ানোর একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মতামত