ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহী এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারের জোট বাহিনীর মধ্যকার সশস্ত্র সংঘাত তৃতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করায় দেশটি নতুন করে এক মারাত্মক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের ফলে দেশের প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ (২২ মিলিয়ন) মানুষ এখন জরুরি মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ বাবুল মান্দেব প্রণালী এবং আশেপাশের পর্বতমালায় তীব্র যুদ্ধের কারণে সাধারণ মানুষের জীবন চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ শান্তি বিনষ্টকারী এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন সাধারণ নিরপরাধ মুসলিম বেসামরিক জনগণ। সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকা এবং বাবুল মান্দেব প্রণালীকে কেন্দ্র করে লড়াই মারাত্মক রূপ নিয়েছে। সরকারি সামরিক দলগুলো উপকূলের সমান্তরালে অবস্থিত পর্বতমালায় হুথিদের বিরুদ্ধে তাদের অগ্রগতি অব্যাহত রাখার দাবি করলেও মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের দুর্দশা কাটছে না।
সংঘাতের তীব্রতা এড়াতে মোখা ও জুবাব অঞ্চল থেকে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক জীবন বাজি রেখে ছোট ছোট নৌকায় করে বাবুল মান্দেব প্রণালী পার হয়ে আফ্রিকার দেশ জিবুতিতে পাড়ি জমাচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় ৩,০০০ ইয়েমেনি শরণার্থী জিবুতিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানা গেছে।
ত্রাণ পৌঁছানোয় বাধা
জাতিসংঘের মহাসচিবের মুখপাত্র স্টেফেন দুজারিক সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, ইয়েমেনের প্রায় ২২ মিলিয়ন মানুষ যুদ্ধের কারণে তীব্র মানবিক সংকটে রয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কেবল গত আগস্ট মাসেই ১৮ হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন করে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অব্যাহত গোলাবর্ষণ, সংঘাত এবং কৌশলগত জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত ও বাস্তুচ্যুত মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় খাবার ও চিকিৎসা সামগ্রী পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছে।
লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু বাবুল মান্দেব
আগস্টের শেষের দিকে হুথি বাহিনীর অগ্রযাত্রার পর থেকে বাবুল মান্দেব প্রণালী এবং সংলগ্ন দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূল রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সরকারি সমর্থিত 'আ মালিকা' এবং 'জাতীয় ঢাল' (হোমল্যান্ড শিল্ড) ব্রিগেডের সেনারা কেহবুব পর্বতমালার দিকে আক্রমণ জোরদার করেছে। এই পাহাড়ি অঞ্চলটি মোখা ও জুবাব শহরকে দেশের ভেতরের অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সরকারি বাহিনী হুথিদের তিনটি বড় হামলা ব্যর্থ করে দেওয়ার এবং বেশ কয়েকজন হুথি যোদ্ধাকে হত্যার দাবি করলেও স্বাধীন পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন, কেহবুব অঞ্চলে এখনও কোনো পক্ষই একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
অপরদিকে, তায়েজ শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে সরকারি বাহিনী 'শুহাদা' ও 'নুমান' পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে, যা হুথিদের শহরটি পুনর্দখলের চেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিয়েছে। একই সাথে, এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে তাদের উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা জেনারেবল ফিরাক মহসিন আল-আসারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে হুথি গোষ্ঠী।
সমুদ্রপথে বিপজ্জনক যাত্রা
বাস্তুচ্যুত সাধারণ মানুষ কেবল প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে লোহিত সাগরের উত্তাল তরঙ্গ অতিক্রম করছেন। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) সতর্ক করে জানিয়েছে, হাজার হাজার শরণার্থী অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও কাঠের নৌকায় ভেসে জিবুতি পৌঁছাচ্ছেন। তবে জিবুতিতে পৌঁছানো এই মুসলিম শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং জীবনযাত্রার পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন ও করুণ।
মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক ও কৌশলগত অঞ্চল ইয়েমেনে এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত অব্যাহত থাকলে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি গোটা মুসলিম উম্মাহর একটি বিশাল জনসংখ্যা চিরতরে মানবিক বিপর্যয়ের অতলে তলিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
মতামত