ভারতশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের জম্মু শহরের উপকণ্ঠে রাইকা বনাঞ্চলের রহিম নগরে এক যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রায় এক ডজন অস্থায়ী বসতি ও ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় বন বিভাগ ও প্রশাসন। শনিবার সকালে চালানো এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা নির্যাতিত মুসলিম রোহিঙ্গা পরিবারগুলো।
মিয়ানমারে চরম সামরিক নিপীড়ন ও গণহত্যা থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রশাসনিক চাপ ও উচ্ছেদের মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। জম্মু ও কাশ্মীরের শীতকালীন রাজধানী জম্মুতে গত এক মাসের মধ্যে এটি দ্বিতীয় বৃহত্তম উচ্ছেদ অভিযান, যার মাধ্যমে অসংখ্য রোহিঙ্গা পরিবারকে পুনরায় গৃহহীন করা হয়েছে।
শনিবার (০৩ অক্টোবর, ২০২৬) সকালে জম্মুর রাইকা বনাঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত রহিম নগর এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করে বন বিভাগ, ফরেস্ট প্রোটেকশন ফোর্স, রাজস্ব বিভাগ এবং জম্মু পুলিশ। যৌথ বাহিনীর এই অভিযানে এক ডজনের কাছাকাছি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
নোটিশ না দেওয়ার অভিযোগ ও ক্ষতিগ্রস্তদের আর্তনাদ
স্থানীয় অধিবাসী স্টিফেন, যিনি গত ১০-১২ বছর ধরে ওই এলাকায় বসবাস করছেন, তিনি তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানান যে প্রশাসন তাদের কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা বা লিখিত নোটিশ প্রদান করেনি। সকালে হঠাৎ দলবেঁধে এসে তাদের ঘরবাড়ি ভাঙতে শুরু করে, যার ফলে ঘরের মালামাল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরানোর পর্যাপ্ত সময় তারা পাননি। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'আমি আমার সন্তানদের নিয়ে এখন কোথায় যাব? আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে।'
অন্যদিকে, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থী আবদুল খালেক নিজেদের অসহায়ত্বের বিবরণ দিয়ে বলেন, 'আমরা আমাদের জন্মভূমিতে চরম নির্যাতন ও নিপীড়ন থেকে রেহাই পেতে জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমরা এখানে চিরতরে থাকতে আসিনি। আমাদের কাছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাও (UNHCR) কর্তৃক ইস্যুকৃত অফিসিয়াল পরিচয়পত্র রয়েছে। কিন্তু আজ আমাদের সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই, আর সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছি।' তিনি এই মানবিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিবেচনা করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আকুল আবেদন জানান।
প্রশাসনের দাবি ও বিতর্কিত অবস্থান
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, সরকারি বনভূমির প্রায় পাঁচ হেক্টর জমি অবৈধ দখলের আওতায় এসেছিল এবং উক্ত এলাকায় কেবল নিয়ম মাফিক বেআইনি স্থাপনাগুলোই উচ্ছেদ করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে অভিযানের আগে দু'বার মৌখিক সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল এবং মহিলা পুলিশ সদস্যদের সাহায্যে নারী ও শিশুদের সরিয়ে নিরাপদে নেওয়া হয়। ফরেস্ট অফিসারের ভাষ্যমতে, 'এই পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে নয়, এটি কেবল সরকারি বনভূমি পুনরুদ্ধারের নিয়মিত প্রক্রিয়া। বনের আইন সবার জন্য সমান।'
তবে মানবাধিকার কর্মী ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের কট্টর হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক পরিবেশের অংশ হিসেবে সংখ্যালঘু ও বিশেষ করে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ক্রমাগত টার্গেট করা হচ্ছে।
এক মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় উচ্ছেদ ও ডেমোগ্রাফিক কার্ড
উল্লেখ্য, এর মাত্র এক মাস আগে জম্মুর কারিয়ানি তালাব এলাকায় আরেকটি বড় ধরনের উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে রোহিঙ্গাদের বসতি তুলে দেওয়া হয়। জমি মালিকদের নোটিশ দিয়ে রোহিঙ্গা পরিবারের কাছে জমি ভাড়া দেওয়া বন্ধ করার চাপ তৈরি করা হচ্ছে।
এই প্রশাসনিক তৎপরতা মূলত জোরদার হয় গত ১০ থেকে ১২ আগস্ট জম্মু পরিদর্শন করা 'ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ সংক্রান্ত সেন্ট্রাল হাই-লেভেল কমিটির' কার্যক্রমের পর।
সরকারি তথ্য অনুসারে, জম্মু ও কাশ্মীরজুড়ে বর্তমানে ৭,৬৫৬ জন চিহ্নিত রোহিঙ্গা বসবাস করছেন, যার মধ্যে ৬,৭৩৭ জনই জম্মু বিভাগের ১০টি জেলায় এবং ৯১৯ জন কাশ্মীর উপত্যকায় রয়েছেন।
মতামত