ভারতের মধ্যপ্রদেশের কাটনি ও জাবালপুর রেলস্টেশন থেকে পুলিশের হাতে আটক হওয়া ১৬৩ জন মাদ্রাসা শিক্ষার্থী দীর্ঘ ১০ দিন পর মুক্তি পেয়েছে। গত ১০ এপ্রিল বিহার থেকে মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে রহস্যজনকভাবে তাদের আটক করা হয়। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) আইনি প্রক্রিয়া শেষে তারা নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি পায়।
মধ্যপ্রদেশ পুলিশ এবং চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির (CWC) পক্ষ থেকে এই অভিযানের স্বপক্ষে সুনির্দিষ্ট যুক্তি প্রদান করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা একটি গোপন অভিযোগ পেয়েছিলেন যে, বড় একটি শিশু-কিশোরের দল 'অননুমোদিতভাবে' রেলপথে ভ্রমণ করছে। রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মতে, "অভিভাবকদের উপস্থিতি ছাড়া এত বিপুল সংখ্যক শিশুকে ভিনরাজ্যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি করতে নিয়ে যাওয়া স্বাভাবিক বিষয় নয়।" মূলত পাচার বা আইনি নথিপত্রের অভাব থাকতে পারে—এমন আশঙ্কার জায়গা থেকে সিডব্লিউসি-র নির্দেশে তাদের আটক করা হয়েছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে শিশুদের সুরক্ষায় একটি 'প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা' হিসেবে দাবি করা হয়েছে।
ঘটনাটি শুরু হয় গত ১০ এপ্রিল। বিহারের আরারিয়া জেলার জোকিহাট এলাকা থেকে ১৬৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থী পাটনা জংশন থেকে যাত্রা শুরু করেছিল। তারা ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের মাদ্রাসায় পড়াশোনার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। তাদের সাথে আটজন প্রাপ্তবয়স্ক তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন। ট্রেনটি যখন মধ্যপ্রদেশের কাটনি ও জাবালপুর স্টেশনে পৌঁছায়, তখন পুলিশ তাদের কামরা থেকে নামিয়ে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ ১০ দিন পুলিশি হেফাজতে থাকার পর স্থানীয় কংগ্রেস বিধায়ক আরিফ মাসুদ শিক্ষার্থীদের মুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ২৪ এপ্রিল প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় দেখা যায়, তিনি মুক্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সাথে কথা বলছেন। এই ১০ দিন শিশুদের পরিবারগুলো চরম উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে পার করেছে। বিশেষ করে পবিত্র রমজান বা ঈদ-পরবর্তী পড়াশোনার মৌসুমে শিশুদের এভাবে গণহারে আটক করায় তাদের শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে এবং তারা মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং আইনি বিশ্লেষকদের মতে, ভারতে নাগরিকদের এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে শিক্ষা বা অন্য প্রয়োজনে ভ্রমণের পূর্ণ সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করাকে অপরাধ বা 'সন্দেহজনক' হিসেবে দেখা ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর এক ধরনের হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটি (CWC) সুরক্ষার কথা বললেও, পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ ছাড়া শিশুদের ১০ দিন আটকে রাখা তাদের মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাচার রোধের নামে বৈধ শিক্ষার্থীদের হেনস্তা করা কেবল বৈষম্যমূলক নয়, বরং এটি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর প্রতি প্রশাসনের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ। এই ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন যে, কার অভিযোগে এবং কোন যুক্তিতে দীর্ঘ ১০ দিন শিশুদের আটকে রাখা হলো। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এবং শিশুদের নাগরিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
মতামত