ভারতে হিন্দুত্ববাদী ও চরমপন্থী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের (ভিএইচপি) আপত্তির মুখে নতিস্বীকার করে গুজরাট সরকার তার অফিসিয়াল বার্ষিক দিওয়ালি ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণ থেকে খ্যাতনামা কবি আজিজ তঙ্কারভির একটি কবিতা সরিয়ে নিয়েছে। রাজ্যের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগ থেকে প্রকাশিত ‘গুজরাট দীপোৎসবী অঙ্ক’ সাময়িকীতে প্রকাশিত কবিতাটিতে রাম ও মীরা বাইকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য রয়েছে—ভিএইচপির এমন দাবির পর তড়িঘড়ি লেখাটি বাদ দিয়ে সেখানে কবি প্রকাশ ‘জালাল’-এর একটি কবিতা প্রতিস্থাপন করা হয়। এ ঘটনা ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম সাহিত্যিকদের অভিব্যক্তি প্রকাশে হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সেন্সরশিপ ও বৈষম্যমূলক মানসিকতাকে আবারও উন্মোচিত করেছে।
ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজ ও তাদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর হিন্দুত্ববাদী দলগুলোর আগ্রাসন অব্যাহত রয়েছে। এর সর্বশেষ শিকার হয়েছেন প্রখ্যাত কবি আজিজ তঙ্কারভি। গুজরাট সরকারের ঐতিহ্যবাহী বার্ষিক প্রকাশনা ‘গুজরাট দীপোৎসবী অঙ্ক’-এর চলতি বছরের অনলাইন সংস্করণ থেকে তাঁর লিখিত কবিতাটি সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর সরাসরি আপত্তির মুখেই মূলত গুজরাটের বিজেপি সরকার এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ভিএইচপির দাবি, সাময়িকীর ৩৮৯ নম্বর পৃষ্ঠায় প্রকাশিত কবিতাটিতে হিন্দু দেবতা রাম ও মীরা বাইকে নিয়ে ‘আপত্তিকর’ ইঙ্গিত রয়েছে, যা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৩ অক্টোবর, যখন ভিএইচপির আহমেদাবাদ অঞ্চলের সম্পাদক অশ্বিন প্যাটেল গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ভূপেন্দ্র প্যাটেলের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠায়। চিঠিতে কবিতাটি অবিলম্বে বাজয়াপ্ত ও অপসারণ করার পাশাপাশি কবি আজিজ তঙ্কারভি এবং লেখাটি অনুমোদনকারী সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
চিঠিতে যুক্তি দেওয়া হয়, দিওয়ালি উৎসবটি বনবাস শেষে রামের অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের সাথে জড়িত; ফলে সরকারি এই উৎসব সংখ্যায় একজন মুসলিম কবির উক্ত সাহিত্যকর্ম প্রকাশ করা ‘অনুচিত’। কেবল কবিতা অপসারণেই ক্ষান্ত হয়নি হিন্দুত্ববাদী এই গোষ্ঠীটি; তারা দাবি তুলেছে যে, ভবিষ্যতে যেকোনো সরকারি সাময়িকীতে কোনো লেখকের রচনা প্রকাশের পূর্বে তাঁর বিগত জীবনের লেখালেখি ও মতাদর্শ ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ ও ‘স্ক্রিনিং’ করতে হবে। একই সাথে কেবল দেশ, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতি ‘ইতিবাচক’ ভাবাপন্ন লেখকদেরই যেন সরকারি প্রকাশনায় স্থান দেওয়া হয়—এমন শর্ত চাপানোর দাবি জানায় তারা।
গুজরাট ভিএইচপির মুখপাত্র হিতেন্দ্রসিন রাজপূত সরকারি এই সিদ্ধান্তের পর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আনন্দিত যে রাজ্য সরকার দ্রুত আমাদের আবেদন গ্রাহ্য করেছে এবং বিতর্কিত কবিতাটি ম্যাগাজিন থেকে মুছে ফেলেছে।”
এ ঘটনা প্রসঙ্গে মন্তব্যের জন্য গুজরাট সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার বিভাগের সচিব বিক্রান্ত পান্ডের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। বর্তমানে গুজরাট তথ্য কমিশনারেটের দাপ্তরিক ওয়েবসাইটে কবিতাটি বাদ দিয়েই ম্যাগাজিনটির ডিজিটাল সংস্করণ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন প্রতিষ্ঠিত মুসলিম কবির সাহিত্যকর্মকে সরকারি ম্যাগাজিন থেকে এভাবে ছেঁটে ফেলা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর অবনতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি অনুসরণেরই নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
মতামত